নাইমার জীবন

নাইমা এভাবে হুট করে চলে যাবে, ভাবিনি।

নাইমার জন্ম হলো। তার ক্ষুধা পেয়েছে এই গ্রহে এসে। জন্মদাত্রী কোন এক অজানা কারণে তার দুগ্ধভাণ্ডার সরিয়ে নিচ্ছে।
সদ্যোজাত সন্তানের এই বৈষম্যের জন্য তার নাম দেয়া হলো "নাই মা"
গাভীর দুধ খেয়ে যাত্রা শুরু হলো তার পৃথিবীর।

নাইমার দিনগুলো খুব ভালভাবেই কেটে যাচ্ছে। ফারহান,ফারজানা,লামিয়া৷ জামিয়ার সাথে তার দুনিয়ার সখ্যতা!
তাদের টুপাভাতি খেলার সাথিও হয়ে গেছে সে। বুদ্ধিও ভাল তার। তবে একটা মারাত্মক দূর্বলতা আছে তার। সে জনদরদী। মানুষের উপস্থিতি টের পেলে সে তাদের পাশে ঘেঁসবে। মানুষের ভাষা সে বুঝে, কিন্তু কথা বলতে পারে না।
ছাগলছানার এই আচরণ তাকে সবার প্রিয় করে তুলেছে৷ বাইরে থেকে আসলেই পায়ে এসে ঘসা শুরু করবে সে। যেন, এই বাড়িতে একটি জীবই আমাকে ভালবাসে। এই পশুর স্পর্শ আমাকে মনে করিয়ে দেয়, বেঁচে থাকা উচিত।
"আসো!" বললেই সে কই থেকে যেন দৌড়ে চলে আসে। স্বভাবজাত ছাগলের মতো সে অবাধ্য নয়, একবার সরিয়ে দিলে সে সেখানে বিরক্তি উৎপাদন করতে আসে না।

রোদ উঠলে বাচ্চাদের সাথে মেতে উঠে খেলায়। বাচ্চারাও এই ছাগলছানার আচরণে আনন্দ পায়। কারণ, সে দৌড়ায়। ডাক দিলে লাফিয়ে লাফিয়ে আসে।

সকালে আমি বের হচ্ছি। নাইমা রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে গেলো। আমি ধমক দিয়ে ফেরত পাঠলাম। আর মনে মনে ভাবলাম, "তোর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে আনাদের!"

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২। আমি বিকালে বাড়ি ফিরলাম। ঘরে এসে জুতা খুলছি। আর বিরক্ত হচ্ছি। নাইমা এতক্ষনে অবশ্যই আমার পায়ের কাছে এসে ঘেঁসতো। আমি ডাকলাম,"কই?" "আসো!"
আসলো না। দুধের বোতলটা ভরা। মানে বিকেলে সে আসেনি।
আমি কিছু বলার আগেই,
আব্বা বললো, "ছাগলছানাটা মারা গেছে!"
আমি স্তব্ধ! চোখ ছলছল করে উঠলো।
চোখ আড়াল করলাম। ৫ টাকার ছাগলের জন্য কান্না মানায় না।
আম্মা খুব কাঁদছে। কারণ, আমরা কেউ যখন বাসায় থাকিনা, এই প্রাণির সঙ্গই তাকে হাসিখুশি রাখতো।

নাইমা পথবিহার করতে বেড়িয়েছে। কী সুন্দর মাঠ! সবুজ-শ্যামল মাঠের শস্যক্ষেতে দোল খাচ্ছে সকালের সোনালী রোদ। পাশেই জলাধার। টলমল করছে দীঘির জল।
নাইমা একা। মাঠে এই মুহুর্তে কোন কৃষক নেই। সকালের রোদ্র তাপাতে আসে আলাপী মহিলারা। আজ তারাও নেই।
"ঘেউ" করে উঠলো একটা কুকুর। দাঁত খিচিয়ে দৌড়াচ্ছে ওরা।
নাইমা বুঝে ফেলেছে। এই দৃষ্টি অস্বাভাবিক। সে দৌড়াচ্ছে প্রাণপনে। আশেপাশে কোন মানুষ নেই। সে জানে তার এই গ্রহে তার বন্ধু অনেক। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা তাকে খুঁজতে আসবে।
সে দীঘির কিনারে আশ্রয় নিয়েছে।  কুকুরের পাল হামলে পড়ার জন্য আবার ধাওয়া করতেই পানিতে পড়ে গেল সে।
আমি তখন হাসিমুখে বসে আছি স্কুলে,
ফারজানা, ফারহান বেড়াতে গেছে, তাসিন আম্পায়ারিং করার প্রস্তুতি নিচ্ছে খেলার,
মা রান্না করছে, বাবা সভার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত।
আর নাইমার এই ছোট্ট জীবন দুনিয়ায় ছড়িয়ে গেলো মায়া।
সে শিখিয়ে গেলো আমাদের, জীবন মাত্র ৫ মাসের! অথচ জনম জনম ধরে আমি স্থানিয়াছি নিজেরে শ্রেষ্ঠ জীবের হৃদয়বেদীতে।

নবীনতর পূর্বতন