পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক ঘৃণিত ব্যক্তিদের শিরোমণি অ্যাডলফ হিটলারের চরিত্রের কিছু ভালো দিক আছে। মানুষ সবসময় সাদা আর কালোর মিশ্রণে হয়। কোন মানুষের মধ্যে আলোর উপস্থিতি বেশী, কোন মানুষের মধ্যে আঁধারের। হিটলার যে এই দ্বিতীয় ধরণের মানুষ, সেটা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান কারণই ছিল তাঁর মাত্রাহীন আগ্রাসন ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল নিয়ে ক্ষোভ। হিটলারের ভাল দিক গুলোঃ-
১। কম বয়সে মাত্রাতিরিক্ত ধূমপান করতেন হিটলার। কিন্তু জার্মানীর সর্বাধিনায়ক পদে অভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি ঘোর ধূমপানবিরোধী হয়ে পড়েন। তিনি মনে করতেন সিগারেট পয়সা-ধ্বংস ছাড়া আর কিছু করে না। জনপরিবহণ ব্যবস্থায় ধূমপান নিষিদ্ধ্ব করে দিয়ে তিনি একটি ধূমপানবিরোধী প্রচারাভিযানও চালান।
২। সাধারণ মানুষের প্রতি যাঁর দয়ামায়ার এত অভাব, লক্ষ লক্ষ ইহুদির সর্বনাশ করতে যাঁর হাত কাঁপেনি, সেই হিটলারই আবার আশ্চর্য রকমের সংবেদনশীল ছিলেন পশুদের প্রতি। তাদের ওপর কোন রকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরিক্ষার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন তিনি, আর তাই দেশে ভিভিসেকশন (Vivisection) অর্থাৎ গবেষণার কাজে পশুদের দেহ-ব্যবচ্ছেদকে নিষিদ্ধ করেন নাৎসী পার্টি ক্ষমতায় আসার পরেই। মাছ-মাংস তিনি ছুঁতেন না। হিটলারের ইচ্ছা ছিল যুদ্ধজয়ের পর নিরামিষাশী জীবনযাপনকে জার্মানীর জাতীয় নীতি হিসাবে ঘোষণা করবেন।
৩। হিটলারের দুটি প্রিয় কুকুর ছিল, ব্লন্ডি (Blondi) ও বেলা (Bella)। প্রাণাধিক প্রিয় ব্লন্ডিকে হিটলার আত্মহত্যা করার আগে হত্যা করেন, যাতে তাঁকে ছাড়া কুকুরটিকে কষ্ট করে বেঁচে না থাকতে হয়।
৪। পুরোনো ধারার চিত্রশিল্পের ভক্ত: হান্স থমা (Hans Thoma), অ্যাল্ব্রেখট ড্যুরর (Albrect Durer), লুকাস ক্রানাক (Lucas Cranach the Elder), জোহানেস ভারমির (Johannes Vermeer) প্রমুখ প্রবাদপ্রতিম জার্মান চিত্রকরদের অন্ধ ভক্ত ছিলেন হিটলার। তাঁর ইচ্ছা ছিল, এই সমস্ত শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পীদের সব শিল্পকর্ম নিয়ে একটি মিউজিয়াম গঠন করবেন।
৫। হিটলার একজন চিত্রশিল্পী হতে চাইতেন রাজনীতিতে প্রবেশের আগে। চিত্রশিল্প নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য তিনি দুইবার ভিয়েনা শিল্প বিদ্যালয়ে আবেদনও করেন। দুইবারই তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। প্রকৃতপক্ষে হিটলারের ফ্যাসিবাদী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশের অন্যতম কারণ ছিল চিত্রশিল্পী হিসাবে তাঁর অসফলতা। চিত্রশিল্পে আগ্রহ ছাড়াও হিটলারের সীমাহীন আগ্রহ ছিল অপেরা সঙ্গীতে। বিশেষত জার্মান নাট্যপরিচালক ওয়াগনারের (Wagner) অপেরা লোহেনগ্রিন (Lohengrin) ছিল তাঁর অসম্ভব প্রিয়।
৬। হিটলার জার্মানীতে তাঁর শাসনতন্ত্র কায়েম করার পর পরই তিনি সমস্ত আন্তর্জাতিক ধার বাতিল করে দিয়ে জার্মানীর নিজস্ব মুদ্রা প্রবর্তন করেন এবং একটি জাতীয় অর্থনৈতিক প্রকল্প তৈরী করেন সাধারণ মানুষের জন্য। সেই প্রকল্পে তিনি বিভিন্ন জনসাধারণ-কল্যাণ
মূলক কাজ যেমন বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নতুন রাস্তা, সেতু, ক্যানাল তৈরী, বন্দর তৈরী, বাড়ি ও সরকারী কার্যালয়ের পুনঃনির্মাণ ইত্যাদি রূপায়নের চিন্তা করেন। এই প্রকল্পে সাধারণ মানুষকে বেতন হিসাবে জার্মান গভর্নমেন্ট 'শ্রম শংসাপত্র' (Labour Treasury Certificate) প্রদান করেন। এই প্রশংসাপত্রটি ছিল কোন সাধারণ মানুষের সরকারকে দেওয়া শ্রম অথবা দ্রব্যের প্রমাণ। যখন এই প্রশংসা পত্রের অধিকারীরা অন্যত্র এই প্রশংসাপত্র ব্যবহার করতেন মুদ্রা হিসাবে। এভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে জার্মান মানুষ তাঁদের শোচনীয় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন এবং অর্থনীতিকে নতুন শিখরে পৌঁছে দেন।
৭। মাত্র পাঁচ বছরে জার্মানী ইউরোপের সবচেয়ে গরীব দেশ থেকে সবচেয়ে ধনী দেশে পরিণত হয়। বেকারত্ব সমস্যা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়। মুদ্রাস্ফীতি বন্ধ হয়। হিটলার সুচতুরভাবে একইসঙ্গে দ্রব্যের চাহিদা ও যোগান বাড়িয়ে জিনিসের দাম স্থিতিশীল রাখেন। এক কথায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য অস্ত্র-নির্মাণ করার আগে পর্যন্ত জার্মানী ছিল সেই সময়ে পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধশালী দেশ।
৮। হিটলারের আমলেই জার্মানীর মানুষ দেখেন ইউরোপের সেই সময়ের সব থেকে বড় নির্মাণ কাজ গুলির মধ্যে অন্যতম জাতীয় সড়কপথ ব্যবস্থা। এই রাস্তার মাধ্যমেই জার্মানীর দূরতম প্রান্তগুলিও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়। একটি সুসংহত সড়ক-পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে সারা দেশ জুড়ে আর এর সবটাই ছিল হিটলারের মস্তিষ্ক প্রসূত।
