বাতাস কেটে কেটে পথ চলছি। অজগর সাপের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তাটির পাশে একটি নদী। নদীর নাম সুতিয়া। কে বা কারা এই নামকরন করেছিলেন সেটা অজানা। নদীটি মৃতপ্রায়।
একসময় এই নদী ছিল প্রমত্তা। উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় কাঁঠালের হাট, বাবুয়ার ঘাটে আসতো বানিজ্যিক নৌকার বহর। পাট বোঝাই ইঞ্জিনের জাহাজগুলো সশব্দে চলে যেতো এই পথ ধরে। সুতিয়া নদীর উপর প্রাচীন লাল রেলসেতু। বড়লাট উইলিয়াম হার্ডিঞ্জ এর আমলে নির্মিত হয়েছিল এই রেলসেতু। লাল রঙের বৃটিশ রাজত্বের শোষনের সাক্ষী হয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে।
নদীর তটরেখা ধরে সামনে যাচ্ছি। তিন নদীর মোহনা এসে মিলিত হয়েছে এখানে। ত্রিমোহনী। বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহিদ খাঁর নামে একটা সড়ক হয়েছে। শাহীদ খাঁ সড়ক। সেড়কের পাশে খিরু নদী। নদীর পাড়েই একটা কংক্রিটের ব্রিজ। তার পাশেই একটা ইটের ভাটা। সুউচ্চ চিমনিতে সুর্যের তেজ আছড়ে পড়ছে।
কয়েক শতাব্দী পুরোনো এক মহাবটবৃক্ষ। বৃক্ষটির সাপের মতো প্রকান্ড শেকড়গুলো সুতিয়ার পানি স্পর্শ করে আছে। পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ একসময় এই বৃক্ষের উপর এসে ধ্বনিত হতো।
গাছের নিচেই একটা কালী মন্দির। সিন্ধু নদের তীরে বহু প্রাচীনকালে এক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। সিন্ধু সভ্যতা। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর স্মৃতিতে ভাস্বর এই সভ্যতা। এই ভারতের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই অঞ্চলে কল্পিত হয়েছে প্রাকৃতিক পূজা -পার্বন। এক একটি উপাদানের অধিকর্তা হিসেবে একজন দেব-দেবী কল্পনা করেছে তারা। সৃষ্টি হয়েছে পুতুল পূজা ও পৌত্তলিক। সিন্ধুর অদূরের হিমালয়কে ধরা হয়ে দেবতাদের আবাসস্থল। শিবের বাসস্থান। গঙ্গা বিধৌত এই অঞ্চলে গঙ্গাকে ধরা হয়ে পাপমোচন কারী পূন্য জলাধার। আর উপকারী পশু গরুকে স্থান দেয়া হয় দেবতার আসনে!
কালিমন্দিরের পাশে নদীর বিপরীতে বেঁকে চলে গেছে কংক্রিটের পিচঢালা পথ। পথের বাঁকে লাল সাদা পিলার। এগুলো গেড়ে দেয়া হয়েছে দূর্ঘটনা আটকানোর জন্য।
ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। আমি একটা ইঞ্জিনের গাড়িতে চড়ে আছি। গাড়ির নাম অটো রিকশা। রিকশাওয়ালা একটু আধপাগল ধরনের। সে একটু পরপর বলে, "বুঝলেন ভাই, বউটারে রাখা গেলো না।"
কিছুদূর এই পথে এগুলেই একটা ইস্পাতের পুল।
পুলের পাশেই চৌধুরী বাড়ী। চৌধুরী বাড়ীর কাছে বলেই এই ব্রিজের নাম চৌধুরী ঘাট ব্রিজ। ব্রিজের নিচেই প্রবাহিত বলদীঘাট নদী।
বলদীঘাটের এই ব্রিজ থেকে কিলোখানিক দূরেই একটা স্কুল। চারতলা ভবনের পাশে খেলার মাঠ। ঐতিহ্যবাহী বলদীঘাট বাজারের অশ্বত্থ গাছটির পাশে বিদ্যালয়টি দাঁড়িয়ে আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের বছর দুয়েক আগ থেকে।
আমি আছি এই স্কুলে। প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দীন বিএসসি ডাকলেন,"এনামুল...এনামুল রে..."
জ্বি স্যার। বলতে বলতে দৌড়ে আসলো একজন লোক। বয়স ৩২ এর মতো। লাল কালো ডোরাকাটা একটা টিশার্ট পড়েছে সে।
জালাল স্যার। বি এস সি। তিনি এই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। ষাটোর্ধ বয়সেও তিনি রসিকতায় পটু। তাঁর কক্ষে দুটি তৈলচিত্র টানানো। ১৯৯৯ সালের এসএসসি ব্যাচের পুনর্মিলনী উপলক্ষে উপহার। বিপরীত দিকে দুইটি এয়ার কণ্ডিশনার। দুটি একসাথে চালালে বিদ্যুতের ভোল্টেজে চাপ সৃষ্টি হয়।
ফিউজ পড়ে যায়।
পাশের রুমটি সহশিক্ষকবৃন্দের জন্য। একটা ক্যাবিনেট রাউন্ড টেবিলে মন্ত্রীদের মতো আসন পাতা সেখানে। ফুলের তোড়া বা মাইক্রোফোন রাখার স্থানে আছে ব্যবহৃত মার্কার, অগোছালো খাতা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের টোকেন ইত্যাদি।
এনামুলকে চা আনতে বলা হলো।
পশ্চিমের দিকে জানালার পাশে কয়েকটি চায়ের দোকান। ৩ কাপ চা, বললেই জানালার ওপাশে থেকে চা হাজির হয়।
সবুজ ফতুয়া পাঞ্জাবি পরা সহাস্য মুখে একজন ব্যক্তিত্ববান স্যার বসে আছেন। মজিদ স্যার। আমার প্রিয় একজন শিক্ষক। তিনি ডাকলেন,"রশিদ, অ্যাই রশিদ!"
রশিদ এসে দাঁড়ালো। পঞ্চাশের কোটা পেরিয়েছে। একটু ভারিক্কি চালে চলে সে। শিক্ষকদের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রেও সে ঝোপ বুঝে কোপ দেবার পক্ষপাতী।
"বিল পাঠাইছো?"
"বিল নিয়ে একটু পরেই বের হমু। "
স্কুলের পাশ দিয়ে চমৎকার একটা পিচঢালা পথ। সেটি চলে গেছে জৈনা বাজারের দিকে।
নাইম স্যার দাঁড়িয়ে আছেন স্কুল ক্যান্টিনে। সেখানে ক্যেকটি ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আইসক্রিম খাচ্ছে।
হাসাহাসি করছে পরস্পর। আকাশে এক ঝাঁক পাখি আকাশ বিহার করছে। এই সময় আকাশে এত পাখি থাকার কথা না। কেন এই পাখিরা এই ছেলেদের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে? উদ্দেশ্য বুঝা গেল সহসাই!
পাখির হালকা সবুজ বিষ্ঠা অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর আকর্ষনে নিচে নামছে। হাস্যরত এক মেয়ের বুকের উপর এসে সেটা লেপ্টে গেল!
হাসি পরিণত হলো লজ্জায়!
