নন্দনপার্ক ভ্রমণ

8.25 যাত্রাবিরতি গয়েশপুর।
বাস ছাড়লো ৯ টায়। প্রমত্তা সুতিয়া নদীর উপরে কংক্রিটের ব্রিজ। নদীকে বিদায় জানিয়ে সামনে চলেছে যাত্রীবাহী বাহন।
মিনিট পাঁচেক পরে আবার যাত্রা বিরতি। বাবু স্যার আসবেন। তাঁর বাসা এখানেই। তিনি এক সুদর্শন ছেলে নিয়ে হাজির হলেন।মুখে আকাশী নীল মাস্ক। সিঁথি কেটে চুল আঁচড়ানো।
স্যার পড়েছেন ফুল ছাপ দেয়া ঘিয়ে রঙ শার্ট। একে একে আসলেন, প্রিয় ভূগোলবিদ্যা স্যার খান কালাম। তিনি রাস্তার স্বরূপ উপস্থাপন শুরু করলেন। যা বাস চালকের অজানা, তিনি তা কৌশলেই জেনে নিতে পারেন। এটা অভিজ্ঞতা। যা শিক্ষার চেয়ে মূল্যবান।
লাল শাড়ি আর চমৎকার লিপস্টিক পড়ে এসেছেন ফারহানা ম্যাম। তাকে সুন্দর লাগছে। তাঁর ভ্রমনসাথী হয়েছে এক তরুনী। স্কুল ড্রেস পড়ে আছে সে। ড্রেস দেখে মনে হচ্ছে সে খায়রুল্লাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী।
হন্তদন্ত করে বাসে উঠলেন ফারহানা ম্যাম।
"১ ঘন্টা আগে এসে আমি বসে আছি!" আর তারা আমাকে রেখে চলে আসছে!"
বললেন তিনি। তার কণ্ঠে ক্ষোভ।
বাস যাত্রা শুরু করলো। বসন্তের হাওয়া বইছে প্রকৃতিতে। সেই বাতাস কেটে কেটে সামনে যাচ্ছে আমাদের বাস। এ বাসে শিক্ষকেরা বসে আছেন।
আমার পাশের সিটেই বসেছেন, আরিফ স্যার। তিনি চোখ বুজে আছেন। পাশে আছেন শিবলী স্যার। স্যারের হাতে কালো ঘড়ি। ঘড়ির জুয়েল রূপালী রঙের। তার সামনের সিটেই বসেছেন মামুন স্যার। তার চোখের চশমাটি কালো। তিনি মাঝেমধ্যেই চশমাটিতে হাত দিচ্ছেন।
শাহীন স্যারের টুপি দেখা যাচ্ছে। বাস্তববাদী রসিক মানুষ তিনি। কথা বলছেন না৷

আমাদের পিছনের বাসে বসে আছেন কামরুন্নাহার মিরা। তিনি মেয়েদের মাতৃসম অভিভাবক। ক্ষেত্রবিশেষে মায়ের চেয়ে আপন। তাঁর উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে। মিরা ম্যাম সোনালী রঙের শাড়ি পড়েছেন। তাকে দেখাচ্ছে মনোহর। মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তার সাথে ছবি তুলতে।
বাসে বক্স বেজেই চলেছে। অক্লান্ত উদ্যমে নেচে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা ।

গাড়ি দাঁড়িয়েছে জৈনা। নাস্তা করানো হবে কি না জিজ্ঞেস করতে এসেছেন প্রধান শিক্ষক। তিনি ডাকলেন, "বাবু, অ্যাই বাবু"
নাস্তা করানো হবে কোনাবাড়ি থেকে। গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। পঁচা ভাগাড়, বড় ছোট গাছের গুড়ি, কাঠ, স্কুলের শিক্ষার্থী, উঁচু নিচু ভবন পেছনে ফেলে সামনে যাচ্ছে বাস । আকাশে ৬০° কোনে হেলে আছে সূর্য।
সিরাজদাদা, নৈশপ্রহরী। তিনি রোমান্টিক মানুষ। বয়স ষাটের বেশি। তিনি তার স্ত্রী ও নাতিকে নিয়ে এসেছেন।
শিক্ষার্থীদের হাত দেখা যাচ্ছে। কেটে যাওয়া বাতাস ছুঁতে ওরা এই রাজপথে হাত বের করে বসে আছে। তাদের ভাল লাগছে। বাবু স্যারের চোখ ফাঁকি দিলো না সেটা। তিনি জানালেন তাৎক্ষণিক। হাত ও মাথা ভেতরে নেয়া হলো।
গাড়ি এসেছে অবদার মোড়। এখান থেকে উঠবেন ফিজিক্যাল স্যার। তিনি উঠেছেন।
রাস্তার দুই পাশে বিস্তির্ণ চিরহরিৎ বন। গগনচুম্বী বৃক্ষরাজি সগর্বে জানান দিচ্ছে নিজেদের আধিপত্য। ভাওয়াল মধুপুরের গড়। বনের বৃক্ষরাজির পাদদেশে পড়ে আছে শুকনা পাতা। শুকনা পাতার কার্পেট। ফুট ওভারএর নিচে রেললাইন।
নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুল, শালনা। ময়লার উৎকট গন্ধ আসছে।

আমি ডাকলাম, "শাহীন স্যার, শাহীন স্যার!"
তিনি বললেন,"ভাল লাগছে না।"
ভ্রমণকালীন ক্লান্তির ছাপ পড়েছে তাদের উপর।
নিজাম ভাই বসে আছে আমার সামনের সিটে। তার সাথে চুপ করে বসেছে নিশি।

টাঙ্গাইল সখিপুর এসেছে বাস। সেখানে আনসার সদর দফতরের প্রকাণ্ড প্রাচিরের প্রধান ফটকে দুজন মহিলা বসে আছে। উজ্জ্বল ফর্সা, ফিনফিনে পাতলা কাপড় পড়েছে তারা।
অর্ধপথে প্রকাণ্ড ময়লার ভাগাড়। পাশেই তুলা হইছে বালু। চারদিকে টিন ঘেরা বাক্সের মত একটা ছোট ঘর। সেখানে দুজন লোক বিড়ি খাচ্ছে। একজনের নাম হারিস। সে বিড়ি লুকিয়ে ফেলল।

বাস দাড়িয়েছে এক প্রকাণ্ড লাল ব্যানারের সামনে। সেখানে মুকুট পড়ে হেসে উঠেছে এক রূপবতী নারী। তার পাশেই লেখা ডেজার্টে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই।
পাশেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। নন্দন পার্ক।
প্রকাণ্ড সদর দরজার উপাসে অজস্র নারী পুরুষের আগমন।
নীল হলুদ আর লাল রং কে থিম ধরে ডিজাইন করা হয়েছে এই রাইড আলয়।



ঘড়িতে 11.02 । আমরা পৌছালাম। শিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্লান্ত। বমি হয়েছে রাস্তায়। আর দীর্ঘ ভ্রমণে কয়েকজন যেতে যেতেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

টিকিট দেখিয়ে আমাদের প্রবেশ করাচ্ছেন বাবু স্যার। প্রবেশ দ্বারের পাশেই ফুচকার দোকান। সেলফ সার্ভিস। কালো রঙের বেশ কটি চেয়ার রাখা আছে সেখানে। বাঁধাই করা একটা মাঝারি ধরনের কাঠ বাদামের গাছ। তার নিচে আমরা জমা হলাম। ওয়াশরুম কাছেই। মেয়েদেরকে নিয়ে গেলেন মিরা মেম। আর ছেলেরাও নিজেরা ফ্রেশ হলো। কেউ কেউ পোশাক পরিবর্তন করতে ব্যস্ত হলো।
পাশেই পেডেল চালিত নৌকায় ভ্রমণবিলাসিরা ঘুরছে। সেখান থেকে হালকা বাতাস আছে শরীরে।
আরিফ স্যার আর শিবলী স্যার এর সাথে আমি যাচ্ছি সম্পূর্ন এলাকাটি ঘুরে দেখার জন্য। খাবার সল্পতা লেগেছে ক্যাফে গুলোতে। লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে পাওয়া গেল তিন খানা স্যান্ডুইচ।
ছেলেদের কয়েকজনকে সাথী করে চললাম নৌকায়।

পিয়াস আর এহসান সেই নৌকায় চালক। নৌকার মাথার উপর দিয়ে ঘুরছে ইলেকট্রিক গাড়ি। সেখান থেকে এই বিনোদন কেন্দ্রটি ভালো করে দেখা যায়।
গান শোনা যাচ্ছে, বন্ধুর বাড়ি, জালালী কবুতর...
গান গাইছে বাংলাদেশ ব্লুহাউজ লিমিটেড এর লোকেরা। আজ তারা এখানে একটা বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। তাদের সাদা টিশার্টে বড় করে লাল রঙে 5 লেখা আছে।

সেবার ইমদাদুল হক একাডেমি থেকে আমরা গজনী গিয়েছিলাম। শ্রদ্ধেয় আশিক স্যার স্বনামধন্য আবৃত্তিকার। তিনি মুহুর্তেই বেধে ফেলেন গান। তিনি আমাদের আসর জমিয়ে রেখেছিলেন। শেরপুরের নির্মল পাহাড়ি এলাকা। পাহাড় কাটা হয়েছে। সেখানে অজগর সাপের মতো রাস্তায় চলেছিল আমাদের বাস। প্রায় ২৬ জন মেয়ে সেবার বমি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
বন্যহাতিরা চিকন শব্দে কাঁপাচ্ছিল পাহাড়ের চূড়া। পালিত হাতির দাঁত কেটে রিং পড়ানো হয়।বন্যহাতির দাঁত দুটি অবাধেই বড় হয়। হিংস্র পাল নিয়ে গাছকের গুঁড়িগুলো উপড়ে ফেলে ওরা।
--
ম্যাডামের সাথে ঘুরছে তানজিনা আর সাদিকা। তারা নৌকার মাঝি পাচ্ছে না। আমাদের মাঝিরা তাদের নৌকায় তুললো। আমি নেমে আসলাম। ট্রেনে উঠবো।
খেলনা ট্রেন। ছাদমুক্ত। আমার সামনে পেছনে অনেকেই বসেছে জোড়া করে।
সিটের সামনে হাতল। হাতলে বারবার ধরে থাকার চকচকে রূপালী দাগ। আমি শক্ত করে ধরে আছি সিটব্যাল্ট চিকনা হয়ে গেছে। পেটে টান লাগছে।
গাড়ি চলবে। স্টেশন মাস্টার ঘন্টা বাজালেন। কাঁসার ঘন্টা বেজে উঠলো। টুংটাং...
রোমাঞ্চকর জার্ণি। বৃত্তাকার ঘরের মতো টানেলে আমরা উ.... বলে চিৎকার করলাম।
ক্যাবল কারে উঠবো। সংখ্যায় ৭ জন। টিকিট কাটার আগেই লাইনে দাঁড়ালো ওরা। টিকিট আসলো। তারের মধ্যে ঝুলে আছি। নিচে পড়ে আছে নন্দন দিঘী, যুগলবন্দী মানুষ, শিশুদের খেলাঘর, জলরাজ্য (water kingdom), আনন্দ সংগীত, জলে ভেজা রূপসী কন্যাদলের মুক্তাখচিত আলোকদাম, দর্পন সুরসুন্দরী অভিসারিকা দল, ময়ূরপুচ্ছ খোঁপায় গুজে নেয়া নারী।
পাখির চোখে দেখে নিলাম এই নন্দকানন।
দুপুর গড়িয়ে এসছে। আমরা চলে যাচ্ছি শেষ দর্শনে। ইকোভিলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এটা রিসোর্ট। পাশেই ডিজনিল্যান্ড। ডিজনিল্যান্ড। নীল আলোতে ভরে আছে এই ঘর। বড়ো সরো কিছু পাথরকে সাজানো হয়েছে বরফের নামে। আর কিছুক্ষন থেকে থেকে প্রচণ্ড বিজলী চমকানোর শব্দ।
তারপরেই মিউজিক। শুরু হলো নাচ। ছেলে মেয়েরা নেচে আনন্দ করা শুরু করেছে।
এবার যাবার পালা।
আমরা বেরুলাম। বাইরের একটা হোটেলের নাম ঢাকা হোটেল। সেখানে খাওয়া হলো। হলো ছবি তুলা।
এবার বাসদ্বয় ছুটে আসছে আপন গন্তব্যে।
চোখের সামনে নেমে আসছে সন্ধ্যা।
বাসের জানালার ওপাশে লম্বা ইপিল ইপিল গাছের সারি। নিচে পড়ে থাকা শুকনা পাতার মর্মর শব্দ মিশে যাচ্ছে নকশাদার চাঁদের আলোয়।
রাত নেমে আসছে এই গ্রহের এক প্রান্তে। নৃত্যরত বালিকাদল, বালকের ঝাঁক চলেছে পরিচিত গৃহে।
একই আকাশের নিচের বাসিন্দারা আলাদা হয়ে যাচ্ছে বর্ণে,গোত্রে, ধর্মে আর আভিজাত্যে।
রক্তের মতো লাল হয়ে যাক, পৃথিবীর সবার হৃদয়। ভালবাসায় সিক্ত হোক পৃথিবীর হৃদয়। একের কান্নায় কেঁদে উঠুক সকলেই।
সবাই হেসে উঠুক এই গ্রহের। আনন্দবিলাসে জীবন কাটুক। আর মহান অভিভাবকের কাছে নত হোক সকল হৃদয়। আল্লাহু আকবার বলে সাহসীদের হোক সত্যের জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ বাইয়াত।



নবীনতর পূর্বতন