কারও নিয়ামত-প্রাপ্তিতে, কিংবা কারও সুখ আর উন্নতি দেখলে আমাদের কী করা উচিত তারও একটা চমৎকার নজির কুরআনে আছে।
সূরা আ-ল ইমরানের শুরুর দিকে আমরা দেখি—মারইয়াম আলাইহাস সালামের মেহরাবে তাঁর খালু যাকারিয়া আলাইহিস সালাম এসে নানান ধরনের ফলমূল দেখে বিস্মিত হয়ে যেতেন। এমন ফলমূল, যেগুলোর মৌসুম অনেক আগেই গত হয়েছে বা যেগুলো তিনি নিজেও কখনো দেখেননি। একদিন তিনি জিগ্যেশ করেই বসলেন, ‘মারইয়াম, এগুলো তুমি কোথায় পাও?’
যাকারিয়া আলাইহিস সালামের এই প্রশ্নের জবাবে মারইয়াম আলাইহাস সালাম বললেন,
هُوَ مِنْ عِنۡدِ اللّٰهِ ۖ إِنَّ اللّٰهَ يَرْزُقُ مَنۡ يَّشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ ٣٧
“এগুলো আমার রবের পক্ষ থেকে আসে। নিশ্চয় তিনি যাকে ইচ্ছে বেহিশেব রিয্ক দান করেন।”
আল্লাহর পক্ষ থেকে মারইয়াম আলাইহাস সালাম এই যে অনুগ্রহ পাচ্ছেন, এটা দেখে যাকারিয়া আলাইহিস সালাম কিন্তু হিংসায় ফেটে পড়েননি। তিনি নিজে একজন নবি ছিলেন। তাঁর জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এসব ফলফলাদি না পাঠিয়ে কেন মারইয়ামের জন্য পাঠান—এমন অভিযোগও তিনি আল্লাহর কাছে করে বসেননি। তিনি কী করেছেন, জানেন?
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি নিজে একেবারে বয়োবৃদ্ধ, তারওপর তাঁর স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা। সন্তান লাভের আর কোনো উপায় তাঁর অবশিষ্ট থাকলো না। কিন্তু সেদিন মারইয়াম আলাইহাস সালামের মেহরাবে এমন সব অদ্ভুত এবং অ-মৌসুমের ফলমূল দেখে তাঁর মনে হলো—গত হয়ে যাওয়া মৌসুমের ফলমূল যদি মারইয়াম এখন পেতে পারে, তাহলে এই বৃদ্ধাবস্থায় এবং স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব অবস্থাতেও তো আমি সন্তান পেতে পারি। যে রব মারইয়ামকে এই নিয়ামত দেন, তিনি তো আমাকেও দিতে পারেন।
এই ভাবনা থেকে যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সাথে সাথে মারইয়াম আলাইহাস সালামের মেহরাবে থাকাবস্থাতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে দুআ করলেন। সেই দুআটাও সূরা আ-ল ইমরানে জায়গা পেয়েছে। তিনি বলেছেন :
رَبِّ هَبْ لِيۡ مِنۡ لَّدُنۡكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيۡعُ الدُّعَاءِ ٣٨
“হে আমার রব! আমাকে আপনার পক্ষ হতে একটি উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।”
মারইয়াম আলাইহাস সালামের নিয়ামত-প্রাপ্তি যাকারিয়া আলাইহিস সালামের মনে হাসাদ তথা হিংসার উদ্রেক করেনি; বরং তাঁর মনে জাগিয়ে দিয়েছে বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় সন্তান লাভের ইচ্ছা।
কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন—দুআ কবুলের একটা উত্তম মুহূর্ত হচ্ছে কাউকে নিয়ামত-প্রাপ্ত হতে দেখা বা কারও নিয়ামত-প্রাপ্তির সংবাদ শোনামাত্র নিজের জন্যও দুআ করা, যেভাবে দুআ করেছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নবি যাকারিয়া আলাইহিস সালাম।
কাউকে ব্যবসাতে উন্নতি করতে দেখলে মনে মনে আল্লাহকে বলেন, ‘ইয়া রব! তাকে যেভাবে অবারিত রিয্ক আপনি দিচ্ছেন, সেভাবে আমাকেও দিন।’
কারও সংসারে সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যের সমারোহ দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়ার বদলে আল্লাহকে বলেন, ‘মালিক, সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার মালিক তো কেবল আপনি। তার মতো করে আমার সংসারেও আপনি অঢেল সুখ দান করেন।’
কারও বাচ্চা ভালোভাবে বেড়ে উঠছে, কেউ ভালো চাকুরি পেয়েছে, কারও জীবনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অবারিত বারাকাহ আসছে—এসব দেখে নিজেকে নিয়ে হতাশ হয়ে পড়া এবং ওই ব্যক্তিকে হিংসা করাটা অসুস্থ অন্তরের স্বাক্ষর বহন করে। আমাদেরকে হতে হবে যাকারিয়া আলাইহিস সালামের মতো—কাউকে নিয়ামত পেতে দেখলে আমরা বরং খুশি হবো। আমাদের অন্তরে অন্তরে ছড়িয়ে দেবো তাকওয়া আর তাওয়াক্কুলের পারদ।