ওঠো, হিন্দুস্থান তোমার অপেক্ষা করছে

 “ওঠো, হিন্দুস্থান তোমার অপেক্ষা করছে। 

হিন্দুস্থানের শাসনকার্য ভার আমি তোমাকে দান করলাম।”


ধড়মড় করে ওঠে বসলেন শিহাবুদ্দিন। ভাবতে থাকলেন ক্ষণিক আগের অদ্ভুত ঘটনাটি। স্বপ্ন দেখেছি— আনমনে প্রশ্ন করে নিজেই সে চিন্তা বাতিল করে দেন। স্বপ্ন এতোটা প্রভাব বিস্তার করে না। শ্বেত শুভ্র বস্ত্রাবৃত সাধকের সে-ই কথা বারবার ভাবতে থাকেন তিনি। একবার পরাজিত হয়েছে— দ্বিতীয়বার আক্রমণের আগে নিজের শক্তিতে শান দিতে হবে। শিহাবুদ্দিনের মনে তখন বইছে উত্তাল ঝড়। 


ভারতবর্ষ তখন হিন্দু রাজাদের অত্যাচারে শাসিত হচ্ছিল। রাজস্থান ও হারিয়ানা রাজ্যের শাসক ছিলেন তেমনি শক্তিশালী এক হিন্দু রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান। ১১৯১ সালে থানেশ্বর ও কর্ণাটকের মাঝামাঝি তরাইন নামক স্থানে রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাছে পরাজিত হয় শিহাবুদ্দিন— পুরোনাম মুইযুদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে সাম। ইতিহাসে তা ‘তরাইনের প্রথম যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত। রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান ও তার ভাই গোবিন্দ রায়ের আক্রমণে সে-যুদ্ধে শিহাবুদ্দিন আহত ও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।


এমন পরাজয়ের পর আবার আক্রমণের চিন্তা করাই দুঃসাধ্য। কিন্তু শিহাবুদ্দিনের শরীরে বইছে আফগানি রক্ত— প্রতিশোধ নিতে হবে। দ্বিতীয়বারের মতো হামলা– স্থান একই, প্রতিপক্ষও এক। কিন্তু রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান এবার একা নয়, সাথে আরো দেড়শত যুবরাজ রাজপুত। সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্য প্রায় তিন লক্ষ। আর শিহাবুদ্দিনের সৈন্যসংখ্যা সর্বসাকুল্যে মাত্র ১ লক্ষ ২০ হাজার। 


শুরু হলো অসম যুদ্ধ। তবে এবার অন্যরকম রণকৌশল অবলম্বন করে শিহাবুদ্দিন। ১২০০০ সৈন্য রিজার্ভ করে কিছুটা রক্ষণাত্মক আক্রমণ করে। রাজপুতদের আগ্রাসী মনোভাব আর সংখ্যাতীত সৈন্যের কারণে সারাদিন যুদ্ধ চলার পরেও জয়-পরাজয় নিশ্চিত হয়নি। রাজপুতরা একটু ক্লান্ত হলেই শিহাবুদ্দিন চালে তার মোক্ষম চাল— রিজার্ভ সৈন্যদের দিয়ে নতুন উদ্যমে হামলা করে। এমন অতর্কিত আক্রমণে রাজপুতরা দিশেহারা হয়ে পলায়ন করতে শুরু করে। পৃথ্বীরাজ চৌহানও রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়— স্বরস্বতী নদীর তীরে বন্দি ও নিহত হয়। তার ভাই গোবিন্দ রায়ও নিহত হয়। শিহাবুদ্দিন সাহস, বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভ করে। মুসলমানদের বিজয় হয়। 


শিহাবুদ্দিন এরপর জয় করেন দিল্লি। দায়িত্ব দেয়া হলো সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেককে। সুলতান অগ্রসর হলেন। পথিমধ্যেই এক স্থানে আজানের ধ্বনি শুনে থেমে যান। লাখ লাখ মুসলমান দেখে অনেক অবাক হন তিনি। কৌতূহল মনে নিয়েই মাগরিবের নামাজে দাড়াঁলেন। নামাজ শেষে ইমামকে খুঁজছেন— এ কেমন ইমাম যার নামাজে এতো শীতলতা। এমন দরদভরা তেলাওয়াতে তৃপ্ত হলো মন, শান্ত হয়ে যায় হৃদয়। একটু এগিয়ে ইমামের মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন— “এতো সে-ই জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ, যিনি স্বপ্নে আমায় জানিয়েছেন হিন্দুস্থানের বিজয় সংবাদ।” 


মুহুর্তেই শিহাবুদ্দিন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। শ্রদ্ধার সাথে পরিচিত হলেন সে-ই নুরানি মানুষের সাথে— সুলতানুল হিন্দ খাজা মাইনুদ্দিন চিশতি রহঃ। যাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন শিহাবুদ্দিন। তিনি অনুধাবন করেন— শুধু সামরিক জোরে তিনি ভারতবর্ষ জয় করছেন না বরং এর পিছনে আধ্যাত্মিক শক্তির পুরো প্রভাব আছে। 


শিহাবুদ্দিন— ইতিহাসে মুহাম্মদ ঘুরি নামে পরিচিত এই সুলতানের শাসনামলেই উত্তর ভারত শাসন করেন কুতুবুদ্দিন আইবেক এবং বাংলা ও বিহার মুসলমানদের দখলে আনে মালিকুল গাজি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি। সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেকও খাজাজির খলিফা কুতুবুদ্দিন কাকি রহঃ-র সোহবত অর্জন করে, তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। এভাবেই খাজাজির দোয়ার বরকতে মুহাম্মদ ঘুরি হয়ে যান ভারতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম সফল সমরনায়ক ও সুলতান।


এতো সফলতা কি শুধুই সামরিক দক্ষতায় অর্জিত হয়? সামরিক দক্ষতায় তো তৎকালীন রাজারা আরো শক্তিশালী ছিল কিন্তু তাও মুসলমানদের বিজয় কিভাবে সম্ভব হয়েছে? ইসলামের প্রতিটি বিজয়ের পিছনে সামরিক শক্তি যতটা না ছিল, তার চেয়েও অধিক ছিল আধ্যাত্মিক শক্তি— যুগে যুগে নবি-রসুল থেকে আউলিয়া কিরামগণ সে-সব শক্তি আঞ্জাম দিয়ে গিয়েছেন। অথচ আমরা শুধু গতানুগতিক ইতিহাসটুকুই জানি। আবার অনেকে তো এতোটুকুও জানেনা। ইতিহাস আমরা ভুলে গেছি— ইতিহাসও তাই আমাদের ভুলে গিয়েছে। 


খাজা গরিব নাওয়াজ হিন্দুস্থানের দায়িত্ব মুহাম্মদ ঘুরিকে দেয়ার পিছনের ইতিহাস শোনাবো আরেকদিন ইনশাআল্লাহ।


- শেখ ফরিদ উদ্দিন

নবীনতর পূর্বতন