ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। শরতের শিশিরভেজা সকাল। আমরা বেড়িয়ে পড়েছি মাঠে। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ। মাঠে মাঠে ধানের শীষেরা দোল খাচ্ছে।
তাসিন একটা ঘুড়ি বানিয়েছে। দখিনের ক্ষেতে সেই ঘুড়ি উড়াচ্ছে।
খিলখিল করে আমরা দুজন হেসে যাচ্ছি। কতদিন যেন এই হাসি হাসা হয় না আমাদের।
দাদা খেতে বসেছেন। তিনি জোরে ডাকলেন,"কই রে নাদিং শার হালারা!" কত দিন এই ডাক শুনি না।
আমরা হাপাতে হাপাতে আসলাম। হাত ধুয়ে খেতে বসলাম।
আজকে আমি তোমার সাথে থাকবো দাদা। আমি বলে ফেললাম।
দাদার চোখে পানি এসেছে। অজানা কারণে তিনি কাঁদছেন। তার কান্নায় আমারও চোখ ভিজে গেল।
তাসিন খাবার ফেলে চলে যাচ্ছে।
"দাদা কানতাছে।" কাঁদতে কাঁদতে সে বিচার দিলো মায়ের কাছে। মায়ের চোখও ভেজা। তিনি আগেই কাঁদছেন।
বাবা বাড়িতে নেই।
------
আমি দৌড়ে সড়কে এলাম। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। লতাগুলো পেচিয়ে আছে তেতুলের গাছে। আমগাছের নিচে আমাদের ভাই আরিফ। তার চেহারাটা মনে নেই। ঘন ঘাসের উপর দিয়ে দৌড়াচ্ছি। পায়ে শিশির জমে আছে। ঠাণ্ডা লাগছে। এটা কি স্বপ্ন? এত স্পষ্ট!
মনে হচ্ছে জঙলী লতার ঘ্রাণ ভেসে আসছে।
থৌরাইল বিল। দুপাশে অগণিত গাছ। বাঁশঝাড়। আমাকে যেতেই হবে। আমাদের পরিবার, আমার কলিজার টুকরা ভাই, আমাদের প্রবাদপুরুষ, আমাদের অস্তিত্বকে রক্ষা করার জন্য আমাকে যেতে হবে।
সমুদ্রের চিল যেমন, নিজেদের ছানার জন্য হাজার মাইলের পথ বাড়ি দেয়। খাবার খুঁজে। আমাকেও আসার জন্য চলে যেতে হচ্ছে।
আমাদের দাদা,আমার পরিবার, অনাগত শিশুদের ছেড়ে আমি যাচ্ছি। সাদা কবরের পাশ দিয়ে। কংক্রিটের পুলের উপর দিয়ে, বাঁশঝাড়ের মর্মর শব্দকে পেছনে ফেলে, টং দোকানগুলোকে পাশ কাটিয়ে আমি যাচ্ছি।
কোথায় যাচ্ছি আমি?
ঘুম ভেঙে গেলো। উত্তরার আকাশে কুয়াশার আড়ালে সূর্য দেখা যাচ্ছে। আজ রোদ উঠবে।

