আলামিনঃ এক ব্যথিত হৃদয়ের গল্প

একুশ শতকের প্রথম। আমার শৈশব। আমি পড়ি ক্লাস ওয়ানে। দেউলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমার বয়স্ পাঁচ বছর। আমি স্কুলে যাই আমার বন্ধুদের সাথে। আমার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে আপন বন্ধুরা আমার সাথে স্কুলে যায়। সালেহ মোহাম্মদ,আতিকুল,খাদিজা আমার সহপাঠী। আর একটা গোয়ার ছেলে আছে আমাদের সাথে স্কুলে যায়, সে যাকে তাকে মারধর করে। প্রতিদিন ছেলেমেয়েদের অভিশাপ কুড়ায়। মোটা ছেলেটির সাথে মতের মিল না হলেই খেপবে। ছেলেটির নাম আল আমিন। আল আমিন সম্ভবত তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। স্কুল ছুটির পর আমরা বাড়ি ফিরছি। রাস্তায় আমাদের সবার সাথে সে এক হাত নিয়ে বাড়ি ফিরছে।
এলাকার কোনো ছেলে নাই যে তার মার না খেয়েছে। আমি নিজেও কল্পনায় তাকে কতবার গুলি করে মেরেছি তার শেষ নেই।
সবাই ভয়ে তটস্থ থাকত। আলামিনকে কোন পাখির বাসা দেখানোর অর্থ পাখিটির ভবিষ্যত প্রজন্মের ভবিষ্যত অন্ধকার।
স্কুল ছুটির পর একদিন বিকেলবেলা আমরা গোল্লাছুট খেলছি। আলামিন পড়েছে আমাদের বিপক্ষে। খেলার এক পর্যায়ে তার সাথে বাকবিতণ্ডা হয়। সে মারে আমাকে ও আমার এক চাচাতো বোন কে। আমারও মেজাজ বিগড়ে যায়। আমি ওকে মেরে ফেলব ভেবে দা নিয়ে রাত পর্যন্ত রাস্তা পাহারা দেই। তাকে কোথাও পাওয়া যায় না। দিনেও দেখা হয় না। আমাদের জমি দিয়ে হাঁটবে না, আমার নিষেধ।
ইতোমধ্যে তার নামে খেপানি বের হল,
আলামিন মিনমিন
মুরগির লেদা ভিটামিন।
বললেই কি দৌড়ানি!! আর এলাকার সব ছেলেমেয়েরা এটাতেই মহানন্দে খেপিয়ে চলে।
তোরে খাইছি..... 
সে দৌড়ানি দেয়! ওর ঘাড় তেড়া এটা শহীদ নগরের করো অজানা নোয়। শাহিদ পাগলার ছেলে আলামিন। ও কিন্তু ক্ষেপে। কিন্তু অশ্লীল ভাষা ওর মুখে আমরা শুনি না। বাজে ছাত্র। শেষ বেঞ্চে বসে। গল্প করে বাড়ি ফেরে। শিক্ষকের লাঠি আর কেউ খাক না খাক সে খায়।
এতে তার মনে কোন ক্ষোভ নেই।

ও কিন্তু খুব ভাল ক্রিকেট খেলে। সে ইউনিয়ন পর্যায়ের খেলা খেলে ছোট থেকেই। ব্যাটিং অলরাউন্ডার। বাঘা বাঘা সব বোলার দের সে তব্দা করে দিয়েছে। বল হাতে পেয়েছে প্রচুর মূল্যবান উইকেট।

আমরা কিছুটা বড় হলাম। আমাদের প্রাইমারি স্কুল পড়া শেষ হল। কিন্তু ওর হল না।
স্কুলে গিয়ে সে পড়ালেখা শিখেনি। শিক্ষকের মার খাওয়া আর কটু কথাও শুনেছে। সে 2004 এ স্কুল ছেড়ে দেয়।
স্কুলে যায় না। বাড়িতে কৃষি কাজ করে। ওর মা নেই। বাবার দ্বিতীয় বিয়ে। বিমাতার আচরণ যেমন হয় তার আচরণ তার চেয়ে দশ গুন বেশী।
বাড়ির কাজের ফাঁকে ছোটখাট কাজ করে সে। দাদা তখনও বেশ শক্তিশালী। হেঁটে যেতে পারেন কাওরাইদ বাজার। আলামিন কাঁঠাল পারে, আম পারে। সেও দাদার খুব ভক্ত।
আমরা আরো বড় হতে থাকি। আলামিন তার পরিবার থেকে নিগ্রহের শিকার হতে থাকে। তার ভাত খাওয়া নিয়েও তাকে কথা শুনতে হয়।
আলামিন বাড়ি ছেড়ে দেয়। সে চাকরি নেয় গার্মেন্টস কারখানা য়। গাজীপুরের মালেকের বাড়ি এলাকায়।
মাঝে মাঝে বাড়ি আসে।সুঠাম দেহ। উগ্র ভাবটা একদম নেই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। খুব সুন্দর করে কথা বলে। ওয়াজ নসিহত করে। ঈদের সময় আমরা একসঙ্গে সময় কাটাই। সুজাত ভাই , তরিকুল,আলামিন আমি চাঁদরাতে জোৎস্না দেখি। একসাথে শুয়ে ঘুমাই। সে তার গার্মেন্টসের গল্প করে। তার পরিবার এখন তাকে ভাল পায়। সে উপার্জন করে। ভালই পায় প্রতিমাসে।
আমরা আরো বড় হই। মানুষ যত বড় হয় তার পঙ্কিলতা বাড়ে,তাই তারা পবিত্রতা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। আমাদের অনুসন্ধান ক্ষমতাও ভাটা পড়ে বাস্তবতার আড়ালে।

আমি স্কুল পাশ করে কলেজে ভর্তি হই। আমার বাকি বন্ধুরাও তাই করে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে আতিকুল চলে যায় প্রবাসে।
সালেহ ভর্তি হয় গফগাঁওয়ে। পরবর্তিতে সে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার উপর ডিপ্লোমা করে।

2017 সালের শেষের দিকে । আলামিন বাড়ি এসেছে। খুব সুগন্ধি ব্যবহার করে। কথা বলতে শুরু করলে আর শেষ হয়না। কি না কি বলা শুরু করে আগ পাস পাওয়া যায় না। মাথা গরম হয়।
আবার সব ঠিকঠাক। তাকে বললাম তুমি ইদানীং বেশি কথা বল বুঝিতে পার?
• সে বলল হুম। মাথা গরম হয়ে যায় ভাই। আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
ওকে বিয়ে করানো হয়। বউয়ের নাম নাসরিন।
ও ভাল হওয়া যায়। ও নাসরিনকে অসম্ভব ভালোবাসতে শুরু করে। মেয়েটা ওকে বুঝে না। ঘটনাক্রমে ওকে তালাক দেয়।

ছেলেটি দুঃখ ভাগ করার কোন লোক পায়না। ওর কষ্ট ওকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত করে দেয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ এর হাড় কাপানো শীতের ভোরে শুনলাম , আলামিন পাগল হয়ে গেছে। দৌড়ে গেলাম। ও বিলের পানিতে গান গাইতে গাইতে হাটছে ২ ঘণ্টা।
তার গানের কথা,
সইবার মতো শক্তি দিও,
মনের মত মন দিও আল্লাহ্।
তাকে 7 জন মিলে পানি থেকে তোলা হল।
বাড়িতে নিয়ে আসা হল। তার গান চলল সারা দিন রাত। সে খায় না।
পরদিন তাকে আঁটসাঁট করে বাঁধা হল শিকল দিয়ে। সে হাসে আবার কাঁদে। দরজায় লথি দায়। 3 দিন পর তাকে বের করা হল। হাত কেটে ভেতরে ঢুকে গেছে লোহার শিকল।
সে আবার পাগলামি করে। তাকে গোসল করিয়ে আবার বাধা হয়।

এক মার্চের ভোরে সে উধাও হলে যায়। 2 মাস তার কোন খুঁজ নেই। তার দুটি বোন যথাক্রমে ঝুমা ও নাজমা ভাইয়ের খবর জানতে উদগ্রীব । আমরা ফেসবুক ও সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ওর সন্ধান করতে থাকি। ওকে পাওয়া যায় না। একদিন হঠাৎ সে এসে উপস্থিত। জানা যায় সে চাকরিতে গিয়েছে।

মে মাসে তার পাগলামিটা ভীষণ বেড়ে যায়। এর মধ্যে সে পাগল বেশে ঘুরে আসে দেশের অনেক জেলা ও মাজার। অশ্লীল গালিগালাজ করে সে। গ্রামবাসী ওকে ইচ্ছেমত মারে। লাঠি আর লাথির উপর ওর দিন কাটে।
তাকে দুই হাতে আর দুই পায়ে শিকল বেঁধে রাখা হয় দুই আম গাছে টানা দিয়ে। ও কাঁদে আর হাসে।
শুনেছি আজ নাকি ওকে পাবনা নেয়া হবে।
দুরন্ত আলামীনের আজ দুর্দিন।
যে হারে তাকে নির্যাতন করা হচ্ছে, সে হয়তো নাও থাকতে পারে আমাদের মাঝে।
#📓 Cover

আলামিন ফিরে এসেছে। সে পাগলা গারোদের বর্ণনা দিচ্ছে।
নবীনতর পূর্বতন