সকাল থেকে বিষন্ন লাগছে। মানব জাতির বৈচিত্র অবলোকন করছি। আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর আমার ঘৃণা জন্মে যাচ্ছে। সভ্যতার নামে এই সমাজে, এই দেশে যা হচ্ছে তা মানতে পারছি না।
আমেরিকার সভ্যতা মানে সারা দুনিয়ার রক্তপাত করো, আর মুখে মুখে জপো মানবিকতা, স্বাস্থ্যসেবা। আমাদের দেশেও তার বাস্তবায়ন আছে।
নিজের "কান" কাটি আমরা, সেই রক্ত দিয়ে আয়োজন করি যাত্রাপালার।
কানহীন রক্তাক্ত শরীর দেখে মানুষ হাসে। আর এই হাসি আমাদের হৃদয়ে সুরের ঝংকার তুলে। সেই ঝংকার বহুদিন আমরা হৃদয়ে বয়ে বেড়াই।
এই নৃত্য প্রদর্শনকারী এদেশের প্রায় সবাই। পরিবার,বাড়ি,সমাজ,গোত্র,দল,ধর্ম,রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতেও এই শ্রেণির লোকের সয়লাব।
আমরা নিজেদের অনিষ্ট ভালবাসি। কারো উন্নতিতে আমাদের বুক জ্বলে। আমরা হিম্মতের চেয়ে প্রাধান্য দেই জিহবাকে। কেউ সুস্থ্য হয়ে গেছে এই সংবাদ আমাদের কষ্ট দেয়। আনন্দ দেয় যখন শুনি কারো দুর্দিন চলছে। তেমনি আমার দুর্দিনেও বাকিরা খুশি থাকে।
নিজের চেয়ে কেও যখন দু টাকা বেশি আয় করে, সে শোনায় সাজেশন। আহা বাঙালীর পরামর্শ! পরামর্শ জুড়েই থাকে নিজের আত্মাভিমান। আমার চেয়ে বেশী আয় করে, এই ব্যপার বুঝানোর কত অনবদ্য পদ্ধতি যে বাঙালীরা শিখেছে তা বলে বুঝানো দু:সাধ্য বা অসাধ্য।
শিল্প,সংস্কৃতি, শিক্ষা বা মননের পরিস্ফুটনে যারা কাজ করে তারা সবাই এদেশে সেই অবহেলিত।
অনেক অভিভাবকেরা স্কুল,টিউশনের বেতন দিয়ে মনে করেন শিক্ষক কিনেছেন। অল্প টাকায় টিউশন করানোর ইচ্ছে থাকলেও, করানো যায় না।
আমি আমার গ্রামে ৳ ৫০০ করে টিউশন ফি নিই। বিজ্ঞানের বিষয় আর ইংরেজি পড়াই। পিডিএফ বা printed sheet দেই, পরীক্ষা, problem solving সেশন নিই।সপ্তাহে ৬ দিন। ৫০০ টাকায় এখন কেউ আশেপাশেও টিউশন করায় না। ১০০০/১৫০০। গ্রামেই। সেক্ষেত্রে আমার এলাকার জনৈক শিক্ষক আমাকে ৫০০ টাকার স্যার ডেকেছে। কষ্ট পাইনি। আমাদের স্বভাব।
শিল্পীদের ক্ষেত্রেও এসব বৈষম্য আছে।
এদেশে সবচেয়ে সফল ব্যবসার নাম রাজনীতি। নেতাদেরকে মাথা নুয়ে সালাম করে শুদ্র থেকে শশাঙ্ক, শিক্ষার্থী থেকে মহাশিক্ষক! অথচ জনগনের টাকা মেরেই এরা রাঘব বোয়াল হয়ে উঠে!
আর ধর্মীয় কুসংস্কার গুলো যে এদেশে কতটা ভয়ঙ্করভাবে আঁকড়ে আছে, তা বুঝা খুবই কঠিন। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও আমাকে সে সব অক্ষরে অক্ষরে মানতে হয়। না হলে মনে হয়, পরিবার, সমাজ আমাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করবে। গ্যালিলিও এর মত ১২ বছর জেল খাটার সাহস আমার নেই।
পরিবার বা সমাজকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পরিবার প্রধান বা সমাজপতিরা নিজেরা আইন বানায়, সেটাতে কাজ না হলে বলে, এটা আল-হাদিস। তাতেও কাজ না হলে বলে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন!
এই দেশের নাম বাংলাদেশ।
এদেশে ধর্মচর্চাও বিচিত্র। নামে বা কাজে কে মুসলিম, কে হিন্দু সেটা বুঝা কঠিন। নিজের মতের সাথে ধর্মের যেই আইন মিলে,সেটা মেনে চলে তারা। না মিললে খুঁজে ফতুয়ার ফাঁকফোকর।
নবীজী (স:) যেখানে বলেছেন, সারা দুনিয়ার সব মুসলিম একটি দেহের মতো। একজন আঘাত পেলে যেন সারা দুনিয়ার মুসলিমের অন্তরে ব্যথা পায়।
সেখানে, একজন মুসলিমের বাড়ি গুঁড়িয়ে, আরেক মুসলমান মৌলভীসাব বলেন,"বাড়ি ভাঙতে তার নারী সহ*বাসের চেয়ে মজা লাগছে।"
এই দেশের নাম, বাংলাদেশ।
এদেশের সবচেয়ে আজব ব্যপার হলো, এদেশে গুনীর কদর নেই। তাই এদেশে গুনী জন্মায় না। যদিও কেউ জন্মায়, সে চলে যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেবা করতে।
আমরা ভাষানী,হক,মুজিব বা জিয়াকে যেমন চিনি, তেমন কি সত্যেন বোস, জেসি বোস, জামাল নজরুল ইসলাম, জাহিদ হাসান তাপস,চন্দ্রশেখর ভেনকট রমনকে চিনি। ড.ইউনুস রাজনীতিতে না আসলে তাকেও হয়ত সেভাবে চেনা হতো না।
আমি শিউর এদেশে যতজন মানুষ সারজিসকে চিনে, ততজন মানুষ সক্রেটিসের নাম শুনেনি।
এদেশে যে যা পারে, সেই ক্ষেত্রে নিজেকে জগতের সেরা মনে করে। চাটুকাররা সেই ফাঁকটিই লুফে নিয়ে আত্মবিশ্বাসীকে দোহন করে।
সমালোচনা সহ্যের ক্ষমতা এই জাতির নাই!
