শহীদ নগর উচ্চ বিদ্যালয়



একটা হলুদ কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আমাদের ক্লাস। অষ্টম শ্রেণি। ক্লাসের পূর্বদিকের জানালার ওপাশে বিল। প্রশস্ত জলাধারের নাম কুঁড়ি বিল। স্থানীয় জনগন ডাকে কুইড়া বিল নামে। এই বিলে আকাশের ছায়া পড়ে। বিলের পাড়ে আমাদের ক্লাস ঘেঁষে একটি প্রকান্ড কড়ইগাছ। রেইনট্রি। তার নিচেই বিল। উলুখাগড়ার পাশেই বেহায়া গাছ। গাছে বেগুনী রঙের ফুল ফুটে আছে। মাইকের মতো ফুল। অনেকেই এই গাছ দিয়ে জীবন্ত বেড়া বানায়। দুই পাশে একটা সাপোর্ট দিয়ে এক সারিতে পুঁতে দেয়া হয় গাছগুলো। নাম এহেতু বেহায়া(নির্লজ্জ),এরা সাধারণত আঘাতে-অপমানে মারা যায় না। কিছুদিন পরে এই বেড়ার হরিৎবনে আসে বেগুনী পুষ্পরাজি।
পূর্ব আর উত্তরের জানালার লোহার শিকলের পাশ দিয়ে শীতল বাতাস খেলে যায়। কুড়িবিলের জলধোয়া বাতাসেরা আন্দোলিত করে এই বিদ্যাপীঠ। লোহার শিকেরা বিক্রিয়া করে জলীয় বাষ্পের সাথে।


গ্রামের নাম শহীদ নগর। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এই অঞ্চলে আব্দুল মান্নান নামে এক মুক্তিযুদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন। স্কুলের পাশেই রেললাইন।সমান্তরাল লাইনগুলো সভ্যতাকে কাঁধে নিয়ে চির অপূর্ব প্রেমাস্পদের মতো বয়ে চলেছে সার্ধশতবর্ষ ধরে। প্রশস্ত মাঠের নরম সবুজ ঘাসেরা পরস্পরের সাথে নিবিড় বন্ধনে বদ্ধ হয়ে আছে। ঘাসমাতার সন্তানদের সাথে যেন শিক্ষার্থীদের গভীর মিতালী।

আমাদের একজন জামাল উদ্দিন স্যার ছিলেন। সহাস্য, সদালাপী কিন্তু কড়া মেজাজের প্রধান শিক্ষক। তিনি এখন ক্লাসে। আজ বেপারী কালাম স্যার এখনো স্কুলে আসেন নি। তাই ইংরেজি ক্লাস নিবেন তিনি। আজ পড়াচ্ছেন আর্টিকেল। ইংরেজ গ্রামারিয়ানরা কিছুটা পাগলা কিসিমের। এরা কলমের আগে a বসায়, কিন্তু হাতির আগে বসায় an. a elephant বললে ক্ষতি কী সেটা অজানা।
বাইরে বসন্তের ছোঁয়া।  কুঁড়িবিলের উদ্ভাসিত পবন এসে ধুয়ে যাচ্ছে ক্লাস। স্যার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে ক্লাস নিচ্ছেন।

আমাদের একজন বাবু স্যার ছিলেন। সনাতন ধর্মের বলে এই নাম। আসল নাম বাদল চন্দ্র দাস। এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা সারা স্কুল জীবনে স্যারের আসল নাম জানে না। আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় এই শিক্ষককে নিয়ে গর্বিত থাকি আমরা। জান্নাত জাহান্নামের কথা শুনলে খুব খারাপ লাগতো। যখন শুনতাম, জান্নাতে আমাদের একজন বাবু স্যারের দেখা যদি না পাই, খুব খারাপ লাগবে। তখন ৮ম শ্রেণির ছাত্র।

আমাদের ভয়ের বিষয়ের নাম গনিত। আর যিনি এই ক্লাস নেন, তাকেও ভয়। শান্ত মানুষ। মারেন, তবে কম। কিন্তু কথাগুলো মনে হয় অন্তরাত্মা ভেদ করে চলে যায়। আমরাও মানি। শ্রদ্ধা ও ভাললাগা কাজ করে। মনে হয়, এমন একজন শিক্ষক হওয়া আসলেই গৌরবের। 
একবার তিনি আমাকে বললেন, আফজাল ৮ম শ্রেণি থেকে পানির জগটা নিয়ে আসো। আমি গেলাম। খালি জগ নিয়ে আসলাম। তিনি বললেন, পানির উৎসের কাছ থেকে খালি পানি পাত্র আনতে হয় না। আমি এর পর কোনদিন আর খালি পাত্র আনি নাই। পানির উৎসের কাছ থেকে।

আমাদের একজন লং কালাম স্যার ছিলেন। অনেক লম্বা ও কয়েকজন আবুল কালাম থাকার জন্য এই নাম। অমায়িক, স্বভাবসুলভ সরলতা ওনাকে অনন্য করেছিলো। তিনি সামাজিক বিজ্ঞান টাইপের বিষয়গুলো পড়াতেন। তাবলীগ জামাতে তখন ভাগ ছিল না। তিনি ছিলেন তাবলীগের কর্মী। অনেক অনেক শিক্ষামূলক গল্প দিয়ে আমাদের জীবনকে আজো সাজিয়ে রেখেছেন স্বর্নালী সম্ভারে। তার বক্তব্যের মূলকথা ছিলো, মানবিক হও, দুর্বলের পাশে দাঁড়াও।

আমাদের একজন নূর আহমদ স্যার ছিলেন। শান্ত ও স্বভাবসুলভ সরলতা বৈশিষ্ট্য ছিলো তারও। মাঝে মাঝে কড়া শাসন করতেন। আবার হেসে উঠতেন। আমরা বুঝলাম, শিক্ষার্থীরা একচেটিয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস পছন্দ করে না। logical ও illogical ব্রেইন ব্যবহার করে পড়ানো গেলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা যায়। আজকাল এই ব্যপারটা আমি জানি। বাস্তবিকভাবেই এটা সত্য। ইউরোপে এভাবেই পড়ানো হয়।

আমাদের সোহরাব আলী স্যার ছিলেন। ফিজিক্যাল স্যার। স্পোর্টস এর আগে অ্যাসেম্বলিতে বলতেন, দল, জায়গায় দাঁড়িয়ে তালে তালে পা রাখবে, তালে, তাল!
তখনি দুজন ঢোল বাদক একইসাথে ঢং করে বাড়ি দিতো। এভাবে বিভিন্ন ক্রীড়াশৈলীতে সারা মাঠ প্রদক্ষিন করতো। বাঁশিতে সজোরে ফুঁ দিয়ে কাটতো ক্রীড়াদিবস। বাংলা ব্যকরনের কারক ও বিভক্তি পড়াতেন চমৎকার করে। স্কুলের অতীত ইতিহাস।  অতীত বর্তমান উঠে আসতো তাঁর কথায়। স্যার এখনো আছেন। আছে তারুণ্য। ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক নিজেও এক জীবন্ত ঐতিহ্য।

শাহাব উদ্দিন ঢালী স্যার। তিনি বিজ্ঞান পড়াতেন। গনিত পড়াতেন। খুব শান্ত স্বরে কথা বলতেন। আমরা মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনতাম তাঁর কথা। একবার তিনি চোখের পলকে ব্ল্যাকবোর্ডে প্রকান্ড এক কুনোব্যাঙ এঁকে ফেললেন। আমরা এতই অবাক হলাম! জীবনে প্রথম কোন প্রানীর রিয়ালিস্টিক ছবি আঁকা দেখলাম। আমরা ছবির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। স্যারকে ছবিটা মুছতে মানা করলাম সবাই। তিনি যাবার আগে ছবিটা মুছে ফেললেন। মনে হয় আত্মাটা পুরে যাচ্ছিলো। বর্তমানে তিনি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক।  দক্ষতার সাথেই স্কুলকে এগিয়ে নিচ্ছেন ভবিষ্যতের নাগরিকদের নিয়ে।

একজন আবুল কালাম খান স্যার ছিলেন আমাদের। তিনি ছিলেন জীবন্ত ভূগোল। ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে তিনি আলাপ করতেন সাবলীলভাবে।
তিনি খুব শীঘ্রই অবসরে যাবেন। এই স্কুলের আকাশ বাতাসে থেকে যাবে স্যারের উচ্চস্বরে পড়ানোর স্বভাবজাত ধ্বনিমালা।

আমাদের ছিলেন একজন বেপারী স্যার। কড়া মেজাজের ছিলেন তিনি। মেজাজ বুঝে কথা বলতে হতো আমাদের। ক্লাসের বাইরে শান্তভাবেই তিনি কথা বলতেন। একবার gerund কী এটা না জানার কারনে তিনি বেত্রাঘাত করলেন। তখন তো আর গুগল ছিল না আমাদের কাছে। এক প্রশ্নের উত্তর জানতে শেষ ভরসা গুরুজন বা শিক্ষক। বহুদিন অপেক্ষা করার পর একদিন।  আজ স্যারের মন ভালো। তিনি বাংলা সাহিত্য পড়াচ্ছেন। মন ভাল থাকলে তিনি বাংলা পড়ান মাঝে মধ্যে।  সাহিত্যিক একটা রসবোধ ছিলো।
আমি সুযোগ নিলাম। বলে ফেললাম,"স্যার,Gerund কী?" উত্তর পাওয়া গেলো। উত্তর দিলেন হাসিমুখে, ১০ম শ্রেনির ছাত্র Gerund পারে না? আমি বললাম, জ্বি স্যার।  পারা যাবে।
স্যার এখন অসুস্থ্য। স্যারের সুস্বাস্থ্য কামনা করি।

মৌলভী স্যার।  আমাদেরকে পড়াতেন ইসলাম শিক্ষা। থামতেন। বইয়ের পাতা থেকে চলে যেতেন বাস্তবতায়। তারপর আবার পড়াতেন। জীবন,নৈতিকতা,মানবিকতার পাঠ নিতাম। স্যার কোথায় আছেন, অজানা। তবে, আমার মনে পড়ে।

জীবন চলে যাচ্ছে তার নিজস্ব গতিতে। তবে বিদ্যার ভিত্তি যাদের হাত ধরে, জ্ঞানের দরজায় পা রাখার দক্ষতা যাদের থেকে জানা, তাদের ভুলে যাওয়া, যেন নিজের সাথেই এক প্রবঞ্চনা!
পুনশ্চ:
এখানে জেষ্ঠতার ভিত্তিতে কথা বলা হয়নি। স্কুলের এমপিওতে ক্রমানুসার থাকতে পারে। আমাদের হৃদয়ে সবাই সমান। ব্যক্তিগত malpractices থাকলেও আমার কথা একটাই,
যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়িবাড়ি যায়,
তথাপি আমার গুরু, নিত্যানন্দ রায়! 
নবীনতর পূর্বতন