আবুল হাসেম,আমাদের প্রবাদপুরুষ

বাজারের নাম নতুন বাজার। বয়স ৩০০ বছর। সুম নামে একশ্রেণির হিন্দুরা এই বাজার পত্তন করেছে। বাজারের মাঝখানে একটা প্রকান্ড বটবৃক্ষ।  বৃক্ষকে কেন্দ্র করেই পুরাকালে এই বাজার জমে উঠেছিল। 
৩০০ বছর বয়েসী নতুন বাজারের কোন উন্নতি হয় নি। দুটি সেট ঘর আছে, তাও গত পিরিয়ডের সংসদ সদস্য (ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন)  সেটা মঞ্জুর করেছেন। একটা নামাজখানা আছে। মূল জমি থেকে দক্ষিন পশ্চিমে। সেটার ব্যবস্থা আবুল হাসেম দপ্তরী করেছেন।

আমরা এসেছি নতুন বাজারে। ২০০১ সাল। সোমবারের পড়ন্ত বিকেল। আমার সাথে এসেছেন হাসেম দপ্তরী। তাঁর বয়স ৯০ ছুঁইছুঁই করছে। আকাশে লাল আভা দেখা যাচ্ছে। বাজার জমে উঠেছে।  কত লোক বাজারে! দোকানীরা পন্যের পশরা সাজিয়ে বসে আছে। বাজারে অনেক মানুষ। 
আমি প্রথম শ্রেণিতে পড়ি৷ স্কুলের নাম দেউলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের শেষ বেঞ্চে বসে আমি ফন্দি করি আজ কার সাথে মারামারিটা হবে।

 ছাত্র হিসেবে আমি যাচ্ছে তাই। বয়স ৫ বছর। ৫ বছর বয়সে ভর্তি হবার কারন এই আবুল হাসেম দপ্তরী৷ তিনি স্কুল কমিটির সভাপতি। মাঠের ৬৭ শতাংশ জমি তিনি একাই দিয়েছেন। তার নিয়মিত স্কুলে যাওয়া হচ্ছে। আমি তার হস্তসঙ্গী।

তার আঙুল ধরেই আমার দিন কাটে। তিনি তাই ভর্তি করালেন স্কুলে। আমি হলাম ক্লাসের সর্ব কনিষ্ঠ এবং দুরন্ত সদস্য!

আমার শখ শিক্ষা উপকরণ কেনা। পড়াশোনা না করলেও আমি বাজারের শিক্ষা উপকরনের ভক্ত।( অভ্যাসটা বোধ হয় এখনো আছে) 
সুমের বাজারের পড়ন্ত বিকালে আজ আমার কলম কিনতে ইচ্ছে করছে। লাল কলম।
তিনি এবার বেঁকে বসেছেন। কারণ শুক্রবারের হাটেও আমাকে কলম কিনে দিয়েছেন। তিনি হেসেই বললেন,
--গত আডে তরে না কিইন্না দিলাম?
-- এই আডেও লাগব আমার!
তিনি পড়াশোনা করেন নি। কিন্তু তার প্রজ্ঞা অতুলনীয়।  এই বিশ্বের জ্ঞানসমুদ্রের সব বই তার এ অভিজ্ঞ জীবনের মাপকাঠি তৈরি করতে ব্যর্থ হবে। 
তিনি শিক্ষানুরাগী। স্কুল তার স্বপ্ন। মাঝেমধ্যে স্বপন স্যার(প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক) আসেন। স্কুলের নলকূল,বেঞ্চ যখন যা দরকার হয় তিনি ব্যবস্থা করেন।

তিনি আজ আমাকে কলম কিনে দিচ্ছেন না। আমার রাগ হচ্ছে। আমি দ্রুত তাকে রেখেই একা বাড়িতে চলে এলাম। 

৩০ মিনিট পর দাদা হাসেম দিঘির পাড়ে এসে ডাক দিলেন, "জাফিন..."
আমি দৌড়ে গেলাম৷ ৯০ বছরের বৃদ্ধ লোকটির হাতে বাজারের ব্যাগ, কাধে একটা বড় কচু।  
আমার চোখ ছলছল করে উঠল। এই লোকটাকে আমি সত্যিই অনেক ভালবাসি আমি।
পকেট থেকে কলম বের করে বললেন, "এই নে নাদির শার শালা। আমাকে কইয়া আসবেনা?। আমি তো খুঁজছি অনেক।"

আমি মায়ের কাছে বললাম," মা আমি দাদাকে কষ্ট দিয়ে ফেলছি আজ। "
মা ও আমাকে আমাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। বললেন যার কাছে দোষ করেছ,"তার কাছে মাফ চাও। "
আমি মাফ চাইতে পারিনি। মাফ চাইতে লজ্জা লাগে। কিন্তু আমি এই মহান ব্যক্তির কাছে সেই দোষের জন্য ২০ বছর ধরে অনুতপ্ত!

সূত্রঃ১. 
২. গুগল মানচিত্রঃ
 ২ক।শহীদ নগর নতুন বাজার। 
  ২খ। শহীদ নগর উচ্চ বিদ্যালয়
https://bn.m.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B6%E0%A6%B9%E
নবীনতর পূর্বতন