নির্মল ছায়াঘেরা সবুজ শ্যামল শান্ত গ্রাম শহীদ নগর। তার পশ্চিমে চিলির মতো চিলতে গ্রাম গোয়ালবর। উপমহাদেশের সুফিবাদের ইতিহাসের এক অনন্য স্বাক্ষী অলিকুল শিরোমনি হযরত হাফেজ গোলাম রব রাহিমাতুল্লাহ শুয়ে আছেন এই গ্রামে।

উত্তর দিকে খিলপাড়া গ্রাম। বাংলাদেশ বেতারের প্রখ্যাত গীতিকার আব্দুল হাই আল হাদী জন্মেছেন এই এখানে। এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে!
এই অমর গানের গীতিকার।
উত্তর পূর্বে রয়েছে গোলাবাড়ি। নির্মল বাতাস, পাশেই শীলা নদীর অজগর সাঁপের মতো বয়ে চলা গতিপথ।
পূর্ব দিকটায় দেউলপাড়া গ্রাম। অসংখ্য গুনীন জন্মেছেন এই গ্রামে। এই গ্রামের প্রবাদ পুরুষ প্রিন্সিপাল মিজবাহ উদ্দিন আর ইমদাদুল হক স্যার।
আর দক্ষিনে ছোট বড়াই।
শহীদ নগর গ্রামের বুক চিরে চলে গেছে উপনিবেশিক শাসনের স্মৃতি বিজড়িত রক্তস্নাত সমান্তরাল রেলপথ। এই অঞ্চলের লুট করা মণি-মাণিক্য, মুল্যবান পাথর, মশলা, আমাদের রক্তের বিনিময়ে চাষ হওয়া নীল, গোলাভরা ফসল, রত্নভান্ডার চলে গেছে কয়লা চালিত প্রকাণ্ড ওয়াগনে করে পশ্চিমের দরিদ্র কিন্তু শিক্ষিত দেশ ব্রিটেনে। সেখানে প্রকাণ্ড ইমারত,সুবিশাল সুরম্য প্রাসাদ, অট্টালিকা নির্মিত হয়েছে আমাদের সম্পদ দিয়ে। অথচ এই সম্পদের মালিকেরা পড়ার জুতা পায় না। লজ্জা নিবারণের জন্য যেটুকু কাপড় না পড়লেই নয় শুধু সেটুকুই পড়ে থাকতে হচ্ছে। পুরুষেরা পড়ে আছে এক টুকরো লেঙ্গট।
খাজনার জন্য কী নিদারুন অত্যাচার! এই শহীদ নগরে শিক্ষার আলো ছড়ানো সম্ভব! এটা ভাবার মতো কোন হৃদয় তখন নেই।
প্রচণ্ড বৃষ্টিতে বন্যা হয়ে যায়। ডুবে যায় ফসল, ছনের ঘরের চৌকির কোনায় পানি উঠে যায়। পানিয় জল নেই, শুকনো খাবার নেই। জমিদারের পেয়াদা এসে পিটিয়ে নিয়ে যায় বিবাহযোগ্যা কুমারীর সামনে থেকে তার বাবাকে।
বাবা খাজনার জন্য নিজের মেয়েকে এক মুঠো ভাতের জন্য বিক্রি করে দেয়। আর ইংরেজ অফিসার হার্ডিঞ্জ খুব সস্তায় কিনে নেয়া উন্নত মাংস উপভোগ করে।
১৯৪৭ সাল। গুবরীর আশেপাশের কোন গ্রামেও ফসল হয়নি। মাঠ ঘাট ফেটে চৌচির। নদীর বুকের সাথে কৃষকের বুক লাগিয়ে কানফাটা চিৎকার করে উঠে "হে ভগবান!"
মুসলিমরা কাপড় উলটো করে নামারজ আদায় করে। কান্নায় আকাশ ভারী করে বলে, "ইয়া রাহমান! আমাদের দিকে রহমতের চোখে তাকাও!"
সোমের বাড়ির ডেপুটি মেজিস্ট্রেট অত্যন্ত কড়া ব্যক্তি। তার সাথে বেয়াদবীর ফল চপেটাঘাত বা প্রানদণ্ড। তার বাড়ির সামনে তিনি কোন মুসলিমের আনাগোনা সহ্য করেন না। বিড়ির আগুন চাইতে গিয়ে বল্লমের ধাওয়া খেয়েছে করিম দপ্তরী এই পরশু দিন।
আজ উনি ভয় পাচ্ছেন। একটা আজব সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে মোমেনশাহী থেকে। কোন ভাবেই সংবাদ আটকে রাখা যাচ্ছে না। ভয়টা সেজন্যই। জুলাই এর ২ তারিখ। এলাকাতেও এই সংবাদ কে যেন বয়ে নিয়ে আসলো। সারা দিন মুসলমানদের ঘুম নেই। সংবাদটা সত্য। ভারতে মুসলিমদের কচুকাটা করা হচ্ছে। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন লাশ পাঠানো হচ্ছে পাকিস্তানে। গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে মসজিদ। পাকিস্তান দাঙ্গায় এগিয়ে এলো। সারা পৃথিবীর সকল মুসলমান একই দেহ।
"ইন্নাল মুসলিমা আখুল মুসলিমিন।"
অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো সংবাদটা রটে গেছে এলাকায়। দাঙ্গার আয়োজন হচ্ছে। ৪ঠা এপ্রিল রাতে গ্রামবাসীর ঘুম ভেঙে গেলো। কানফাটা চিৎকার। ঘর ছেড়ে বাইরে আসলো গ্রামবাসী। এই ঘটনা তাদের চোখ আর কখনোই দেখে নাই। আগুন জ্বলছে। গর্জন করতে করতে সোনালী অগ্নীশিখাগুলো একে একে গ্রাস করছে বসত ভিটা, ঠাকুর ঘর, বাচ্চার দোলনা, গোয়াল ঘরের গরু, পড়নের কাপড়।
১৯৪৭ সালের আগস্টের দিনগুলো উত্তাল। গাজিপুরের রাজ প্রাসাদ থেকে অত্যাচারি ভাওয়াল রাজা। গৌড়িপুরের আট আনি জমিদার, ময়মনসিংহের শশী কান্ত আচার্য, সূর্যকান্ত আচার্য। যাদের দাপটে কেঁপে কেঁপে উঠতো সমগ্র ময়মনসিংহ। গতকালকেও যে এক মুসলিমের খাজনা না দেয়ায় হাত কেটে দিয়েছে। তবে গণ জাগরণ সৃষ্টি হয়ে গেছে। পালিয়ে যাচ্ছে অনেক প্রভাবশালীরা।
এক রাতের মধ্যে যথাসম্ভব অর্থ, স্বর্ণ, আর আত্মীয় নিয়ে ভারতে চলে যায় অত্যাচারী শাসকেরা।
গুবরী গ্রামে ভোর আসে আতংকে। qআবুল হাসেম, সুলাইমান আরো গুটি কয়েক প্রভাবশালীরা সারারাত পাহাড়ায় পড়ে থাকেন। নাওয়া নেই খাওয়া নেই। দাঙ্গার আতংকে দেশে উত্তাল অবস্থা। হিন্দু পেলেই খুঁজে বের করে হামলে পড়ছে লোকেরা।
ভারত থেকে মুসলিমদের মেরে পাঠিয়ে দিচ্ছে পূর্ব বাংলাতেও।
ভাইয়েরা ভাইয়ের রক্ত নিয়ে মেতে উঠেছে হুলি খেলায়। শুধু বিশ্বাসের ভিন্নতা একটা জাতিকে একে অপরের প্রতি সহিংস করে তুলছে। স্বর্গীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে সৃষ্টি করছে সন্ত্রাস। অবস্থার প্রচণ্ডতায়, আবুল হাসেম ওদের জড়িয়ে ধরে জানিয়ে দেয়,
"আমি ক্ষমাপ্রার্থি। তোমাদের নিরাপত্তার জন্য আর আমরা যথেষ্ট না। দোয়া করি ভালো থাকো আমাদের প্রতিবেশীরা। তোমাদের এই দেশে থাকা আর নিরাপদ নয়। তৃতীয় কোন পক্ষ এই আন্দোলনে ঘি ঢালছে। "
নদীর এপাড় থেকে নৌকায় তুলে দেবার আগে হাসেমকে জড়িয়ে ধরলো ওরা। কান্নায় ভেঙে পড়লো আবুল হাসেম।
রেললাইনে একটা কয়লার ইঞ্জিন ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হুইসেল দিলো। তিনি পথে নেমে আসলেন। ধুলিমাখা পথ।
তিনি মনে মনে বললেন, " আল্লাহ গো! ওদের সহি সালামতে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখো।"
এক রাতের মধ্যে খালি হয়ে গেল বিস্তীর্ণ জনপদ। ক্ষমতা, ঐশ্বর্য, প্রভাব
ফেলে রেখে অজানার দিকে পা বাড়ালো এদেশের প্রভাবশালী হিন্দু জমিদারের দল।
ভারত থেকে কাটা মাথা,ছিন্ন হাত,কাটা পা, নারীদের বিশেষ অঙ্গ ভর্তি করে একটা ট্রেন পাঠানো হয় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের দিকে। দাঙ্গা চরমে উঠে।
লাশের গন্ধে ভরে যায় ভারতের প্রকৃতির সৌন্দর্য।
এই গত কয়েক মাস ধরে চলমান দাঙ্গায় দশ লাখ হিন্দু-মুসলিম নিহত হয়েছে।
অস্ত্রে শান দিচ্ছে সকলেই। শেষ যুদ্ধ গাজওয়াতুল হিন্দ হয়ে যাবার সম্ভাবনা।
এই গুবরী গ্রাম দেখলো মানুষের নিষ্ঠুরতা, অরাজকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার।
আঞ্চলিক নেতাদের বৈঠক হলো লাহোরে।
মুসলিম নেতা জিন্নাহ তখন পাঞ্জাব প্রদেশ নিজের হাতে পাওয়ায় ব্যস্ত। অথচ চলে যাচ্ছে আমাদের রক্তের দাম দিয়ে গড়ে তোলা কলকাতা। ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ।
লাহোরের গত বৈঠক এর আগেই গফরগাঁও এসেছিলেন বাংলার শের আবুল কাশেম ফজলুল হক। তিনি পাঁচবাগী হুজুরের মুরীদ।
তিনি দেশ ভাগের আগে লাহোরে সকল নেতৃবৃন্দের কাছে প্রস্তাব রাখলেন,
যেসব এলাকা নদী দ্বারা আলাদা, কিন্তু হিন্দুর সংখ্যা অধিক। কিংবা মুসলিমের সংখ্যা অধিক, তাদের জন্য আলাদা আলাদা দেশ হবে। ভারতে হিন্দু মুসলিম এক সাথে থাকা কোনভাবেই সম্ভব নয়। নেতারা করতালিতে এই প্রস্তাব সমর্থন জানালো।
বড়লাটের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছেন জিন্নাহ।
জিন্নাহ এক অদ্ভুত চাল চাললেন।
states কথাটির স্থানে state কথাটি জুড়ে দিলেন। অনুচ্চারিত s এর জন্য আবার পরাধীন হয়ে গেল পূর্ব বাংলা। এক দেশের মাঝখানে আড়াই হাজার কিলোমিটারের এক দেশ, ভারত।
পাকিস্তান আর হিন্দুস্থান।
কান্নায় ভেঙে পড়লো, ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, মুজিব।
হাতছাড়া হলো ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা।
ঠকে গেল পূর্ববাংলা।