মায়ের চিঠি

বড়লোক ছেলের কাছে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা
মায়ের চিঠি---------
.
খোকা,
কেমন আছিস বাবা ? কত দিন হয়ে গেলো তোর
সুন্দর মুখ খানা দেখা হয় না।
জানিস খোকা ! তুই যখন আমার গর্ভে ছিলি, তখন
অসহ্য যন্ত্রনা করতো। খোদার কাছে তখন মৃত্যু
কামনা করতাম। মনে হতো এর চেয়ে মৃত্যুও
অনেক সহজ।
তোর বাবা সারাদিন অন্যের জমিতে কাজ করে
আসতো সেই সন্ধ্যে বেলায়। ফিরে এসে
আমাকে কতই না বুঝাতো আর বলতো আমাদের
ঘরে অনেক ফুটফুটে একটা চাঁদের টুকরো আসবে। তুমি
ওর মুখ দেখে সকল কষ্ট ভুলে যাবে।
.
তুই যখন জন্ম নিলি তখন যেনো আমার কলিজা
ছিড়ে যাচ্ছিল। কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না।
তবুও এ কষ্ট কাউকে বুঝতে দেইনি। নিরবে সহ্য
করেছি। তুই জন্ম নেওয়ার সময়, আমি জ্ঞান হারিয়ে
ফেলে ছিলাম। জ্ঞান ফিরে তোর মুখ দেখে
আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। সকল কষ্ট, সকল
যন্ত্রনা এক মূহুর্তেই ভুলে যাই। সেদিন আনন্দে
কত চুমুই না এঁকেছিলাম তোর কপালে। তুই যখন
পৃথিবীতে আসলি, সেদিন পৃথিবীতে আমার
মতো সুখী কেউ ছিলোদ না।
তখন থেকেই আমরা তোকে নিয়ে কত
স্বপ্নই না দেখেছি। তোর বাবা সারাদিন শেষে
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তোকে কোলে নিয়ে
কতই না মজা করতো। এতো কষ্টের মাঝেও
তোকে নিয়ে সত্যিই খুব সুখে সারদিন কেটে
যেতো ।
.
তখন ছিল প্রচন্ড শীত। এই শীতে একটার বেশি
কাঁথা আমাদের ছিল না। তুই প্রসাব করে দিতি। ঠান্ডা
লেগে যাওয়ার ভয়ে তোকে এক কাঁধে
থেকে আর এক কাঁধে আমার কাপড়ের আঁচলে
সারারাত বুকে জড়িয়ে রেখেছি। তোকে
কখনোই এতটুকু কষ্ট পেতে দেয় নি । 
তোর বাবা শুধু বলতো-তুমি দেখবে খোকার
মা, এই খোকাই আমাদের সকল কষ্ট দূর করবে।
.
তোর বয়স যখন সাত বছর হলো, তখন তোর বাবা
কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। তখন আমি কি করবো
কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তোর এবং তোর বাবার
কথা ভেবে আমি অন্যের বাড়িতে কাজ করে দু
মুঠো ভাত যোগাতাম। এভাবেই আমাদের দিন
কেটে যাচ্ছিল ।
তোকে যখন স্কুলে ভর্তি করে দিলাম, তোর
বাবা আমাদের ছেড়ে অচিন দেশে চলে
গেলেন। তখনও আমি ভেঙ্গে পরিনি, তোর
কথা ভেবে।
কতই না কষ্ট সইয়ে টাকা যোগাড়
করে, তোকে লেখাপড়া করিয়েছি। তুই তো
জানিস না, তোর কলেজে ভর্তির টাকার জন্য কতো
জনেরই না পায়ে ধরেছি। কতো জনই না আমাকে লাথি
মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও তোকে
একবারও এ কষ্ট বুঝতে দেই নি।
তুই যখন শহরে চলে গেলি কলেজে লেখাপড়া
করারা জন্যে, তখনও তোর জন্য খুব কষ্ট 
হয়েছে । কিন্তু নিজেকে এই বলে-সান্তনা
দিয়েছি যে-ছেলে লেখাপড়া করে মানুষের
মতো মানুষ হলে, আমার সকল দুঃখ দূর হবে ।
.
তোর কলেজের টাকা যোগান দেওয়ার জন্যে
দিনের পর দিন কাজ করেছি অন্যের বাড়িতে । 
এভাবেই কেটে যায় ছয়টি বছর । ছয় বছর পর
মস্তবড় এক কম্পানিতে চাকরি হয় তোর। চাকরি
হওয়ার কিছু দিন পর, আমাকে তুই এসে শহরে নিয়ে
গেলি । তোর বিরাট বড় বাড়ি দেখে, আমি অবাক
হয়ে যাই । মনে মনে ভাবি, আমার সারা জীবনের
পরিশ্রম সার্থক হয়েছে ।
এভাবেই সুখে কেটে যাচ্ছিল আমার দিন। হঠাৎ
করে আমাকে না জানিয়ে তুই বিয়ে করে
ফেললি । আমি মনে মনে খুব কষ্ট পেয়ে ছিলাম । 
কিন্তু তোর মিষ্টি কথায় সব ভুলে যাই আমি । বউ
মাকে নিয়ে বাড়িতে আসলি । অসম্ভম সুন্দর ছিলো
মেয়েটি । কথাবার্তাও আরও বেশি সুন্দর ।
কিছু দিন পর আমি রোগে আক্রান্ত হলে, বউ মার
কথায় আমাকে হাসপাতালের নাম করে বৃদ্ধাশ্রমে
রেখে আসলি ।
.
এখানে আমি খুব সুখেই আছি । মাঝে মাঝে
তোদেরকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে, তাছাড়া
তেমন কিছু মনে হয় না আমার ।
তোরা সুখী হ, এই দোয়াই সারাজীবন করে যাব।
ভালো থাকিস বাবা!
ইতি,
        তোর হতভাগা/ওভাগা
                                            মা।

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন