আবুল হাসেম দপ্তরী

আমরা তাঁর শিয়রে বসে আছি। ব্যক্তিত্বে সিংহপুরুষ এই মানুষটি এই অঞ্চল চষে বেড়িয়েছেন। হজব্রত পালন করতে ১৯৯০ সালে পাড়ি দিয়েছেন পবিত্র মক্কা,মদীনায়। ছিলেন স্বর্ণবণিক, পাটের ডিলার, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, দক্ষ সংগঠক। ১৯৪৭ এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় এই অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যেকোন হুমকি বা আক্রমণ তারা বীরদর্পে রুখেছেন।

এখনো কাওরাইদ,বরমী অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন তাঁকে যারপরনাই শ্রদ্ধা করে।

তিনি আজ মৃত্যুশয্যায়।  রমজান মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। আজ সম্ভবত ২৭ তারিখ। বাড়িতে একটা মিলাদ অনুষ্ঠান হবে।
আমি পড়ন্ত বিকালে লাল ঘুড়ির পেছনে পেছনে ছুটে গেছি। দখিনের ন্যাড়াকাটা বিস্তৃত ফসলের মাঠে। একটা কান আমার সদা জাগ্রত।
"জাফিন রে...."
এই ডাক শুনতে পেলে আমি আমার পৃথিবী ছেড়ে তার কাছে চলে এসেছি।
আজ তিনি আমাদের এই পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছেন।
আব্বা সাভার থেকে এসেছেন গত বছর। তিনি বসে আছেন।  তিনি তিলাওয়াত করছেন,"সূরা ইয়াসিন"।
কাকা বসেছেন পায়ের কাছে। ৯৫ বছর বয়েসী নখে একটা কালো দাগ।
গালে ২টি কালো জন্মদাগ। মুখ নড়ছে।মা বসেছেন মাথার কাছে।

তিনি বললেন,"তোমরা মাফ করে দিও"। মা বললেন,"আব্বা, আমাদেরকে আপনি মাফ করে দিন।" বলতে বলতে কান্না শুরু করলেন তিনি।

তিনি উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বললেন,"সব মাফ,সব মাফ"। চোখের কোনে মুক্তার মতো জলবিন্দু জমা হচ্ছে।

৯৫টি বছর এই গ্রহে তিনি পার করেছেন। তাঁর জীবদ্দশায় এই ভুখণ্ডে এসেছে থামের মত মোটা পা ওয়ালা ৭ ফুটি লাল ইংরেজ। এসেছে নীলকুঠিয়াল, পাপিষ্ঠ ভিনদেশী। খিলাফত আন্দোলনে উত্তাল হয়েছে এই গ্রহ। পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজেছে তাঁর চোখের সামনেই। একটি ভেঙেছে দুই দুই বার!

নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ, জাতিয় কবি নজরুল, জসীমউদ্দিন বা জীবনানন্দ বেঁচে ছিলেন তারই সময়ে।
মহাবিজ্ঞানী আইন্সটাইন,লর্ড কেলভিন, অ্যান্ডারসন সেলসিয়াস,মেরী কুরি, পাউলী,বোর, রাদারফোর্ড,ম্যাক্সওয়েল, হিটলার,নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাস বেঁচে আছেন।
সাক্ষাত পেয়েছেন মহাত্মা গান্ধীর।  তার জীবদ্দশায় বেঁচে আছে, মারগুলিস, হুইটটেকার, বিমান আবিষ্কারক রাইট ভ্রাতৃদ্বয়।  সদর্পে হেটে চলেছেন অতুল প্রসাদ সেন, জগদীশ চন্দ্র বসু,সত্যেন বোস, হাইজেনবার্গ বা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক!

হিরোসীমা নাগাসাকিতে দুনিয়াকাঁপানো আনবিক বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে তারই জীবদ্দশায়!  লেলিন, স্টালিন,গর্ভাচেভ ছিলো তার সময় জুড়ে। ইতালিতে "আমি মুসোলিনী" বলতো যেই স্বৈরশাসক, তারঁ আগমনের আলোকছটা পড়েছিল আজকের এই শয্যাশায়ী ব্যাক্তির জীবনেও।

বিশ্ব রাজনীতির চরম মেরুকরণে যখন জন্ম নিলো তৃতীয় বিশ্ব, আমাদের নেতারাও হয়ে উঠলো সহিংস!
বাংলার বাঘ শেরে বাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ভাষানী,মুজিব, জিয়ারা তখন চরম অত্যাচারিত।  জিন্নার "S" অনুচ্চারনে যখন ২৩ বছর ধরে এদেশ দেশ শোষিত,তখন তিনি স্বর্ণবণিক।
স্বাধীনতা পূর্ব নয়টি মাস তিনি প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন মুক্তিসেনাদের।
তখন তিনি ষাটোর্ধ। তিনি এই পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের দিনগুলোতে ছিলেন। বহু যুগ বিভাজন দেখেছেন।
অটোমান রাজবংশের ৬২৩ বছরের শাসন তখনো শেষ হয়নি। ভাওয়াল রাজা,গৌরিপুরের জমিদার,মোমেনশাহীর জমিদারেরা অত্যাচারের খড়্গ চালাচ্ছে নির্বিচারে!  ইসলামের আলোকশিখা তখনো দেদীপ্যমান,  তিনি তখন ছিলেন এই গ্রহেই।
আজ তিনি চলে যাচ্ছেন।
তিনি বললেন,"রাস্তা ছাড়ো,কালিমা পড়ো"।
আমরা অঝোর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে কালিমা পড়লাম। ২৭ রমজান ২০০৮ সালের এক রোদেলা দুপুরে আমাদের বটবৃক্ষের পতন হলো। আমাদের আকাশ থেকে পতিত হলো এক নক্ষত্রের। যে গত শতাব্দীর  সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্বাক্ষী ছিলেন।

এই আবুল হাসেম দপ্তরীকে আমরা কখনোই ভুলি না। আমাদের স্মৃতি এখানে ম্লান হয় নি কখনোই!

নবীনতর পূর্বতন