ভাবী এসে পৌঁছালেন এইমাত্র। চোখ ভিজে আছে। ক্লান্ত শরীর। বেদনার ভার বাইতে যেন আর পারছেন না। আমার ইচ্ছে করছে তাকে গিয়ে বলি,"কেমন আছেন?"
আমি জিজ্ঞেস করছি না। আমি জানি তিনি আজ ভালো নেই।
আমি বসে আছি একটা গ্রামের বাড়ির উঠানে। গ্রামের নাম দেউলপাড়া। এই গ্রামে আজ অনেক জনসমাগম হচ্ছে। দলে দলে গ্রামান্তর থেকে আসছে মানুষ। আকাশে কার্তিকের চাঁদ। চাঁদের আলো তেমন স্পষ্ট হয়নি এখনো। এই বাড়ির উঠানে একটা জাম্বুরা গাছ। গাছে একটা সাদা দুশো ওয়াটের বাতি জ্বলছে। নারী কন্ঠী কান্না ঢুকরে উঠছে একটু পরপর। কান্নারতা নারীদেরকে ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরানো হচ্ছে। বাতির নিচে দুটো চেয়ার। সম্ভবত ডেকোরেটরের। তার সামনে একটা স্টেইনলেস স্টিলের বাহন। বাহন চাকাশুন্য।
সময় আধাঘন্টা আছে। লোকজনের ভীর বাড়ছে। বাহন প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই আবাহনের আরোহী এক মহাযাত্রার দিকে চলেছে। মানুষের এই জয়যাত্রার যুগে সেই ১৯৭৭ সালে মহাকাশের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল ভয়েজার ১ মহাকাশযান। পৃথিবী, শনি, বৃহস্পতি আর ইউরেনাসকে পাক দিয়ে সূর্যকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে সৌরমণ্ডলের বাইরে ইন্টারস্টেলার স্পেসে চলে গেছে মানবসৃষ্ট এক নভোযান। যেখান থেকে আলোর বেগে ডাটা আসতে সময় লাগে ২১ দিন। প্রতি সেকেন্ডে ১৭ কিলোমিটার করে দূরে সরে যাচ্ছে ভয়েজার। কিন্তু এখনো তার খবর আমাদের কাছে আছে। ২০৩০ সাল অবধি সেটা আমাদের হাতে থাকবে। অথচ আজ যে এই মহারথী আমাদের নিজের সামনে চলে যাচ্ছে। তার যাত্রাপথের কোন তথ্য আমাদের কাছে থাকবে না। সম্পূর্ণ অচেনা এক প্রসঙ্গ কাঠামোর দিকে চলে যাবে এই যাত্রী। এই গ্রহের কোন সূত্র বা প্রযুক্তিই সেখানে কার্যকর নয়। আমরা তেমনই এক কাঠামো থেকে এসেছিলাম। সম্পূর্ণ একা। কত বিনিদ্র রাত এখানে কেটে গেছে। কত অশ্রুজল বয়ে গেছে এই গ্রহে। কত ঘাম,রক্ত আর বেদনার বাণ এসে বিদ্ধ করে গেছে আমাদের। তবু এই যাত্রা নিরন্তর।
সময় হয়ে গেছে। বাহনে উঠেছে আবাহনী। মানবজাতির কাঁধে ভর দিয়ে চলছে মানুষের শেষ বাহন। আকাশে প্রদীপ্ত কার্তিকের চাঁদ।
ভাবী ডাকলেন, "মা।"
পেছনে কান্নার রোল বাড়ছে। জীবনের বালু ঘড়িতে আর কিছু ঝরে পড়ার নেই। এত আয়োজন করে বেঁচে থাকার দিনগুলো কেটে যায়। অথচ না বাঁচার দিনগুলো কত সাধারন!
খুব সুন্দর হয়েছে ভাই
উত্তরমুছুন