অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমি আমার গ্রামে ফিরেছি। উন্মুক্ত আকাশের নিচে নির্মল ছায়াঘেরা এক নিভৃত পল্লীজননী। ফজরের আজান হলেই এখানে শুরু হয় মানুষের মুখরতা। শিশুদের দল বেরিয়ে পড়ে হাফপ্যান্ট পড়ে। শিশুদের ঝাঁক। বিভিন্ন কম্পাংকে তাদের শব্দ বাতাসে আশ্চর্য মোহনীয়তা সৃষ্টি করে। আমার ইচ্ছে করে ঘর থেকে বের হই। তাল গাছের নিচে কাড়াকাড়ি করে তাল টুকাই। শরীরে ধুসর রঙের কাদামাটি লাগে। 

জবুথবু হয়ে সবাই আসি হাসেম দিঘির জলে। লাফিয়ে,ডিগবাজি দিয়ে আমরা নেমে পড়ি গোসলে। মায়ের নজরে পড়লে বকুনি দেয়। বাঁশের কঞ্চি নিয়ে দাঁড়ান পুকুরঘাটে।
আমাদের গ্রামের নাম শহীদ নগর। আমি আবার আমার গ্রামে ফিরেছি। বিস্তির্ণ জলাধার থৌরাইল আর বোরান বিলের গ্রামে এসেছি আমি।
রত্নদ্বীপের মতো এক দ্বীপ আছে দুই বিলের মাঝে। ওপারে দেদীপ্যমান সূর্য উঠে। মক্তবে যাবার জন্য আমার লাল নূরানী কায়দাটি আমি হাতে নিই। টুপির ভেতর ভাঁজ করে সেটাসমেত মাথায় দিই।
দুপুরে আমাদের আনন্দের সীমা থাকে না। আমরা বিদ্যালয়ে যাই। গলাগলি করে চলি। আমাদের একটা দল আছে নাম পশ্চিমপাড়ার পুলাপান। সেই দলের দলপতির নাম নূরুল হক। সে খুব ত্যাড়া প্রকৃতির। ছাত্র হিসেবে সে যাচ্ছেতাই। নিজের নাম বাংলা ইংরেজিতে লিখতে পারে কিনা তা আমরা জানি না। আমরা আসলে জানতেও চাই না। আমরা মাত্র টু-থ্রি তে পড়ি। কিন্তু আমাদের নেতা পড়ে ফাইভে। তার গায়ে মোষের মত জোর। কিন্তু সে টিংটিঙে শরীরের। সে বলে, আমারে তোরা ডাকবি "নাইরল হক"। নাইরল মানে নারিকেল।
আমাদের সে নেতামি শেখায়। নেতামীর কিছু নিয়ম কায়দা আছে।
কয়েকটি নিয়ম এই রকম,
- মারামারি জোর করে করা নিষেধ।
- আগে মাইর খাইতে হবে।
- কেউ বুকে আস্তে ধাক্কা দিলে, ওই খা**র পুত বলে তার বুকে দুইগুন জোরে ধাক্কা দিতে হবে। বলতে হবে নাইরল হকের লোকেরে ধাক্কা দেস ব্যাটা....। এতেই সে ভয় পাবে।
- মেয়েদের সাথে মারামারি করা যাবে না। কেউ লাগতে আসলে বলতে হবে বিচি ছাড়া আমরা লাগি না।
- কোন স্যার যেন না দেখে সেটা
আরো কিছু নিয়ম ছিল। মনে পড়ছে না। এই গ্রাম আমাকে আপন করতে থাকে। আমি,আমার শৈশব, আমার স্কুল, আমার বন্ধু আমার বাতাস রেখে আমি যেন কোথাও যেতে পারছি না।
আমি গ্রামে ফিরেছি। শহীদনগর গ্রামের এই নির্মল পরিবেশ আমাকে দু:খিত হতে দেয়নি। অর্থাভাব এসেছে, বাস্তবতার কড়াল গ্রাস মাঝেমধ্যে বেদনার বিষাক্ত বাণে বিদ্ধ করেছে। আমি এই তৃনভূমি, বিষন্ন বক, হলুদ কড়ই, থৌরাইলের জলের সাথে আমার দু:খ বলেছি। কত কেঁদেছি! তারা আমার কথা শুনে, আমার বিবেকদর্পনে সমাধান রচিত করেছে।
আমি মানুষকে আমার দু:খ বলিনা। এই পৃথিবীর মানুষ দুঃখ শুনে মজা নেয়। দুর্বল ভাবে।
এই উন্মুক্ত আকাশের নিচে আমাদের স্কুল। শহীদ নগর উচ্চ বিদ্যালয়। এই স্কুলকে দেখে আমি স্বপ্ন দেখি। একদিন এই শিক্ষার্থীরা দুনিয়া চষে বেড়াবে।
এই গ্রামের দুঃখ ঘুচাবে। ক্ষুধাহীন,দারিদ্র্যহীন মানবশিশু জন্ম নেবে এই অঞ্চলের ঘরে ঘরে।
ভারতের ছোট্ট গ্রাম রামেশ্বরমকে আমরা চিনি। এই গ্রামেই জন্মেছিলেন ভারতের মিসাইলম্যান এপিজে আব্দুল কালাম।
এই এই গ্রামকেও চিনবে এই গ্রহ। এমন একটা স্বপ্নকে বুকে লালন করে আমি গ্রামে এসেছি। আমার ইচ্ছে, একদিন তারা বিশ্বজয় করবে, আমি সেদিনের স্বাক্ষী হবো। আমি এলাম।
সেই প্রত্যাশা ধরে বসে আছি। একদিন ওরা সেরাদের সেরা হবে। আমার বয়স বাড়ছে। চাকরি অস্থায়ী। আমার পরিবার আছে, আমার সন্তান আছে। আমার কল্পনায় আমার গ্রাম, আমার স্কুল। একদিন এখান থেকে ওরা দুনিয়া কাঁপিয়ে দেবে। এই স্বপ্ন এখনো আমি দেখি। আমি ঘুমিয়ে আমার স্কুল দেখি।
আমি ঢাকা ওয়াসার চাকরি ছেড়ে দিলাম। আমার বস আমাকে বললেন, Don't be an emotional fool.
আমি অন্ধের দেশে চশমা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
এখন মনে হচ্ছে,
আমি ওদের নিয়ে অত চিন্তা করি, ওরা কী নিজের জন্য এই স্বপ্ন দেখে।
এই প্রশ্নের উত্তর আমি খুব সম্ভবত পেয়ে গেছি!
আমি আমার গ্রাম আবার ছেড়ে দিচ্ছি!
প্রেম দূর থেকেই সুন্দর! আমার গ্রামকে আমি ভালবাসি! ভালবাসি আমার শিক্ষার্থীদের, আমার প্রাণপ্রিয় শিক্ষকদের, আর আমাদের স্কুলকে। আমি শিক্ষকতার মহান পেশায় আমার সন্তানদেরকেও আসতে দিতে চাই না।
এটা আমার অভিমান? নাকি ব্যর্থতা।
আমার ব্যর্থতা ও অভিমান।
আমি ওদেরকে বুঝতে পারিনি আর ওরাও আমাকে বুঝতে পারেনি।
যে শিক্ষার্থীদের ভাষা বুঝে না, শিক্ষক হওয়া তার অনধিকার। সেটা তার চর্চা করা নিষেধ!
